হানিমুন পিরিয়ড শেষ, কতটা বদলালো নেপালের পররাষ্ট্রনীতি?
- ১৭ কূটনৈতিক মিশনে রাষ্ট্রদূত নেই
- অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর বেশি গুরুত্ব

মে মাসে কাঠমান্ডুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৩ জন রাষ্ট্রদূত ও উপ-মিশন প্রধান এবং রাষ্ট্রদূত বালেন্দ্র শাহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন
সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাসে নেপালের নতুন সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তনসহ ব্যাপক সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর সরকার ১০০ দিন পার করেছে। ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষ হতেই বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন, মূলত নীতিতে নয়, কূটনৈতিক আচরণ ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে নতুন সরকার।
কাঠমান্ডুতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এবং সফররত কয়েকজন বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে একান্ত বৈঠক এড়িয়ে শাহ দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক রীতির ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগত বৈঠকের পরিবর্তে দলগত সাক্ষাৎ এবং আরও মানসম্মত প্রোটোকল অনুসরণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গরসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেননি। একইভাবে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিকেও সাক্ষাতের সময় দেননি। পরে তার নির্ধারিত নেপাল সফর স্থগিত করা হয়।
তবে এসব প্রক্রিয়াগত পরিবর্তনের পরও নেপালের পররাষ্ট্রনীতির মূল অগ্রাধিকার প্রায় অপরিবর্তিত। ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কই এখনো কাঠমান্ডুর কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল দুই প্রতিবেশী দেশ সফর করে তাদের আশ্বস্ত করেন, নেপাল তাদের কৌশলগত সংবেদনশীলতা সম্মান করে।
ভারত থেকে আনা পণ্যের ওপর নেপালের শুল্ক আরোপ এবং নেপালি চা আমদানিতে নয়াদিল্লির বিধিনিষেধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্যেই রয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির সভাপতি রবি লামিছানেকে ভারত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। তিনি ‘উন্নয়ন কূটনীতি’ পদ্ধতির মাধ্যমে নেপাল-ভারত সহযোগিতা জোরদারের পক্ষে মত দেন।
শাহর ঘনিষ্ঠদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী চান ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই নেপালের বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনায় নেতৃত্ব দিক। তবে পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এতে মৌলিক পরিবর্তনের বদলে ধারাবাহিকতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
ভারতে নেপালের সাবেক রাষ্ট্রদূত লোক রাজ বারাল বললেন, ‘নেপালের পররাষ্ট্রনীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। মৌলিক বিষয়গুলো একই রয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে শুধু কূটনৈতিক ধরনে।’
বারালের মতে, শাহর সংযত নেতৃত্বের কারণে শুরুতে ভারত ও চীন উভয়ই নতুন সরকার নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তায় ছিল। তবে ‘ধীরে ধীরে দুই দেশই সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে শুরু করেছে।’
তবে সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সফর এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বিস্তৃত কৌশলগত ইস্যুর পরিবর্তে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নেপালের ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার এবং মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন (এমসিসি) প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়গুলোই গুরুত্ব পেয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খানাল ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন, কূটনীতিকে অবশ্যই পরিমাপযোগ্য অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনতে হবে। তার মন্ত্রণালয় বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, পর্যটন প্রসার, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী নেপালিদের সম্পৃক্ত করার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিয়েছে।
খানাল বারবার বলেছেন, ‘আমাদের কূটনীতি শেষ পর্যন্ত নেপালের অর্থনৈতিক রূপান্তরে অবদান রাখতে হবে।’
সরকার বিদেশে নেপালি মিশনগুলোর সেবার মান উন্নয়ন, অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা জোরদার, প্রবাসীদের বিনিয়োগে উৎসাহ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপের ব্যবস্থাও গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রাথমিক সংস্কারের অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রদূত নিয়োগে শুধু রাজনৈতিক মনোনয়নের ওপর নির্ভর না করে উন্মুক্ত আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করেছে। এতে চার হাজারের বেশি ব্যক্তি আবেদন করেছেন। তবে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোতে এখনো রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
এই বিলম্ব নেপালের বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারও প্রতিফলন। বর্তমানে দেশটির ১৭টি কূটনৈতিক মিশনে রাষ্ট্রদূত নেই। পাশাপাশি সীমিত বাজেটের কারণে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও জনকূটনীতি কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া জার্মান ও ফরাসি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততায় পাসপোর্ট সংগ্রহ-সংক্রান্ত একটি প্রক্রিয়া নিয়েও সরকার বিতর্কের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তব ফল বয়ে আনতে পারে কি না। একই সঙ্গে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যেও নেপালকে জলবায়ু কূটনীতি এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এগিয়ে নিতে হবে।
সরকারের অবস্থান তুলে ধরে সম্প্রতি খানাল বলছিলেন, ‘ভারত ও চীন—এই দুই প্রতিবেশী বন্ধু দেশের সঙ্গে, পাশাপাশি অন্য সব অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, অর্থনৈতিক কূটনীতি গুরুত্ব দেওয়া এবং জাতীয় স্বার্থ কেন্দ্র করে কূটনীতি এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সবার সঙ্গে গঠনমূলক ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করাই আমাদের প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য।’






