নেপাল
পুরনো রাজনীতির সমালোচক আরএসপি হাঁটল একই পথে

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ও আরএসপির সভাপতি রবি লামিছানে
নেপালের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টির (আরএসপি) নেতৃত্ব সাধারণ সম্মেলন নিয়ে বড় বড় প্রত্যাশার কথা বলেছিল। তাদের দাবি ছিল, এই সম্মেলন অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দলটি সেই পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোরই পথ অনুসরণ করেছে, যাদের এত দিন ধরে তারা সমালোচনা করে এসেছে। শুরু থেকেই আরএসপির সীমাবদ্ধতা ও সাংগঠনিক অদক্ষতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নীল রঙের বিশাল বিলবোর্ড ও দৃষ্টিকটু প্রবেশদ্বার, যা এমনকি ট্রাক চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করেছিল, দেখে মনে হয়েছে যেন পুরোনো দলগুলোরই নকশা অনুসরণ করা হয়েছে।
সাধারণ সম্মেলনের আগে প্রতিনিধি চূড়ান্ত করা যেকোনো রাজনৈতিক দলের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু সম্মেলন শুরুর পরও প্রতিনিধি তালিকা চূড়ান্ত করতে আরএসপির চার দিন লেগে যায়। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রতিনিধি তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই আগামী চার বছরের জন্য দলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিপত্র অনুমোদন করা হয়।
এই নীতিপত্র অনুমোদনের প্রক্রিয়াও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। রাজনৈতিক নীতিপত্রে দলটি সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনা-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অবস্থান নিয়েছে। সেখানে জাতীয় পরিষদকে ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে একটি নির্দলীয় বিশেষজ্ঞ পরিষদে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সাধারণ সম্মেলনের রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে দলের সভাপতি রবি লামিছানে উপস্থাপিত ওই নীতিপত্রে সরাসরি নির্বাচিত নির্বাহী প্রধান, পুরোপুরি আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকারে নির্দলীয় নির্বাচন এবং প্রাদেশিক পরিষদ বিলুপ্তির পক্ষেও মত দেওয়া হয়েছে।
এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। বাস্তবায়িত হলে নেপালের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। তাই এগুলো নিয়ে গভীর ও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কোনো বিষয়ই আলোচনার জন্য উত্থাপন করা হয়নি। দলের সভাপতি নীতিপত্র পড়ে শোনান, এরপর প্রতিনিধিদের তা অনুমোদন করতে বলা হয়। প্রতিনিধিরাও তা অনুমোদন করেন। কোনো সদস্যকে মতামত, প্রশ্ন বা আপত্তি জানানোর সুযোগ না দিয়েই নীতিপত্র পাস করা হয়।
পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল নিছক আনুষ্ঠানিকতা। এমনকি দলের নেতারাও তা নিয়ে বিদ্রূপ করে বলছিলেন, ‘৪ হাজার ২০০ প্রতিনিধির নিবিড় আলোচনা মাত্র সাত সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল।’
অব্যবস্থাপনা শুধু প্রতিনিধি তালিকা চূড়ান্ত করতে দেরিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নেতৃত্ব নির্বাচনের ভোটগ্রহণ পরিচালনাতেও দলের অদক্ষতা স্পষ্ট হয়েছে। মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সম্মেলনের মেয়াদ ইতোমধ্যে দুই দিন বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত সময়ের মধ্যেও তা শেষ হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠার মাত্র চার বছরের মধ্যে নেপালের অন্যতম বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আরএসপি যে ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে, তার কারণ শুধু পুরোনো দলগুলোর শাসনব্যর্থতা নয়। মানুষ তাদের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়েও বিরক্ত ছিল। বিশেষ করে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই দলীয় কাঠামোর মাধ্যমে নীতিনির্ধারণের সংস্কৃতি জনঅসন্তোষ বাড়িয়েছে।
বিকল্প রাজনীতির ধারক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা একটি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন এবং দলীয় গঠনতন্ত্রের মতো মৌলিক বিষয়েও গণতান্ত্রিক আলোচনা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে নিজেদের নেতা-কর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়া কোনোভাবেই ইতিবাচক নয়।
আরএসপির সামনে সুযোগ ছিল একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সাধারণ সম্মেলনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করার। কিন্তু সম্মেলন পরিচালনা, প্রতিনিধি চূড়ান্তকরণ, নীতিগত আলোচনা থেকে শুরু করে নেতৃত্ব নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই দলের প্রথম সাধারণ সম্মেলন প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এটি শুধু আরএসপির জন্যই নয়, সংসদের সবচেয়ে বড় দল হিসেবে নেপালের গণতন্ত্রের জন্যও অস্বস্তিকর ও উদ্বেগজনক একটি বার্তা।
দ্য কাঠমাণ্ডু পোস্টের সম্পাদকীয় থেকে অনূদিত।




