সুড়ঙ্গে শুধু কাদা, নেই এক চিলতে ফাঁকও
- নেপালের বন্যায় আটকে থাকা শ্রমিক উদ্ধারে প্রযুক্তিরও হার মানা
- থার্মাল ড্রোন নিয়ে নামলেন উদ্ধারকারীরা, কিন্তু ধ্বংসস্তূপে বন্ধ সব পথ; নিখোঁজ শ্রমিকদের খোঁজে মরিয়া অভিযান

সুড়ঙ্গের ভেতর নেই কোনও ফাঁকা জায়গা, নেই এক চিলতে বাতাস চলাচলের পথ।
প্রাণের সন্ধানে সুড়ঙ্গে ঢুকেছিল প্রযুক্তির চোখ। থার্মাল ড্রোন নিয়ে অন্ধকারের গভীরে নিখোঁজ শ্রমিকদের খুঁজতে নেমেছিলেন উদ্ধারকারীরা। কিন্তু ফিরে এল এক ভয়াবহ ছবি৷ সুড়ঙ্গের ভেতর নেই কোনও ফাঁকা জায়গা, নেই এক চিলতে বাতাস চলাচলের পথ। চারদিকে শুধু জমাট কাদা, পানি আর ধ্বংসস্তূপের স্তর। যেন পাহাড়ের বুকের নিচে তৈরি হয়েছে মৃত্যুর এক অদৃশ্য দেয়াল।
মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারের এই কঠিন বাস্তবতা। আধুনিক প্রযুক্তি, থার্মাল ড্রোন ও বিশেষজ্ঞ দল নিয়েও প্রকৃতির তৈরি সেই ধ্বংসস্তূপ ভেদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালের হিমালয় অঞ্চলে ২৬ আগস্টের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ৯০০ শ্রমিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গত সপ্তাহে হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর নেপালের একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ এখন উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। উদ্ধারকারী দলগুলোর আশঙ্কা, প্রায় ৯০০ জলবিদ্যুৎকর্মী এখনও নিখোঁজ, যাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে উদ্ধার অভিযানে যুক্ত হয়েছেন নেপালের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ড্রোন বিশেষজ্ঞ মনিশ মহারাজন। বন্যার মাত্র দুই দিন আগে তিনি চীনের তিব্বত থেকে রাশুয়াগড়ি সীমান্ত হয়ে নেপালে ফিরেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই পরিচিত পথেই তাঁকে নামতে হয়েছে এক ভয়াবহ উদ্ধার অভিযানে।
ড্রোন দিয়ে খোলা এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে সাফল্য মিলেছে। পাহাড়ের ঢালে বা বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছাতে ড্রোনে লাগানো মাইক্রোফোন ও স্পিকারের মাধ্যমে ডাক দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও গান বাজিয়ে মানুষের সাড়া পাওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে। সেই পদ্ধতিতে কয়েকজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু সুড়ঙ্গের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা বলে জানিয়েছেন মহারাজন। তার ভাষায়, সুড়ঙ্গগুলো এমনভাবে কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ভরে গেছে, যেন কোনও নলের ভেতর ঘন পেস্ট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ড্রোন চালানোর মতো কোনও ফাঁকা জায়গাই নেই।
তিনি বলেছেন, সাধারণ জায়গায় ড্রোনের ক্যামেরা ও তাপ শনাক্তকারী প্রযুক্তি অনেক কার্যকর হলেও সুড়ঙ্গের ভেতরে বাঁক, অন্ধকার, ধ্বংসস্তূপ এবং জমে থাকা কাদার কারণে সেটি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ অংশে পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের রসুয়াগড়ি, আপার ত্রিশুলি-১, ত্রিশুলি-৩এ ও ত্রিশুলি-৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে বহু শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী ও উদ্ধারকারী দল সুড়ঙ্গ পরিষ্কার, পানি সরানো এবং নতুন পথ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
রসুয়াগড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সেনাবাহিনীর দল সুড়ঙ্গের একটি অংশ পর্যন্ত পৌঁছালেও মূল ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেনি। কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পুরো পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
এদিকে উদ্ধার অভিযানে আন্তর্জাতিক সহায়তাও যুক্ত হচ্ছে। ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের খোঁজ চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে মরদেহ শনাক্তকরণ ও নিখোঁজদের তালিকা তৈরির কাজও চলছে।
নেপালের এই বিপর্যয় শুধু একটি বন্যার গল্প নয়, এটি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির এক অসম লড়াই। বাইরে থেকে ড্রোনের চোখ যতই আধুনিক হোক, পাহাড়ের বুকের নিচে জমে থাকা কাদা আর ধ্বংসস্তূপের কাছে এখন সেই প্রযুক্তিও অসহায়। তবু সুড়ঙ্গের অন্ধকারে আটকে থাকা মানুষগুলোর জন্য শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা, হয়তো কোনও এক ফাঁক দিয়ে এখনও মিলতে পারে জীবনের সংকেত।







