শেষ মুহূর্তের ছবি তুলে ধরল সিসিটিভি
চোখের সামনে উধাও আস্ত জনপদ
- এক মুহূর্তে থেমে গেল সীমান্তের জীবন, হিমালয়ের স্রোতে হারাল শত শত মানুষ

বিপর্যয়ের উৎস হিসেবে বিশেষজ্ঞরা হিমবাহ ধস থেকে তৈরি ভয়াবহ ধস ও কাদার স্রোতকে দায়ী করছেন।
একটি কালো দেয়ালের মতো কিছু একটা এগিয়ে আসছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল, হয়তো মেঘের ছায়া। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠল ভয়াবহ দৃশ্য: পানি, কাদা, বরফ, পাথর আর ধ্বংসাবশেষের এক প্রবল স্রোত ছুটে আসছে পাহাড় বেয়ে। স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ১০টা ৫৯ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে নেপাল-চীন সীমান্তের তিব্বতের গিরং এলাকায় থাকা সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই শেষ মুহূর্তের ছবি। এরপরই কয়েক মিনিটের মধ্যে বদলে যায় পুরো জনপদের চেহারা।
২৬ আগস্ট হিমালয়ের বুক থেকে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে নেপাল-চীন সীমান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। গিরং সীমান্ত এলাকা, নেপালের রাশুয়া জেলার রাসুয়াগড়ি এবং টিমুরে–সব জায়গাতেই নেমে আসে ধ্বংসের স্রোত। সেতু, সরকারি ভবন, দোকানপাট, রাস্তা কিছুই রক্ষা পায়নি।
নেপাল ও চীনের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত এই সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করতেন পর্যটক, তীর্থযাত্রী, ব্যবসায়ী, ট্রাকচালক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার অন্যতম প্রবেশপথ হওয়ায় এলাকাটি সবসময়ই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সেদিন কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই ব্যস্ত সীমান্ত পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।
বন্যার আঘাতে নেপালের রাসুয়াগড়ি এলাকায় নেপাল-চীন সংযোগকারী ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ ভেসে যায়। ধ্বংস হয় নেপালের অভিবাসন ও শুল্ক দফতরের ভবনও। সীমান্তের ছোট বাণিজ্যকেন্দ্র টিমুরে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
“শেষ কয়েক মিনিটে কারা কোথায় ছিলেন, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি”
নেপালের অভিবাসন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের আগে ওইদিন সকালে ৮৯ জন নেপালি ও বিদেশি নাগরিক নেপাল থেকে তিব্বতের দিকে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছিলেন। আরও চারজন চীন থেকে নেপালে প্রবেশের তথ্য নিবন্ধিত করেছিলেন। শেষ অভিবাসন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছিল স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৫ মিনিট ৩ সেকেন্ডে–বন্যার ভয়াল স্রোত আছড়ে পড়ার প্রায় ১০ মিনিট আগে।
তবে অভিবাসন দফতরের এই হিসাবই পুরো চিত্র নয়। সীমান্ত এলাকায় থাকা হোটেল, দোকান, গাড়ি পার্কিং এলাকা এবং অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সঠিক সংখ্যা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। স্থানীয় অভিবাসন কর্মকর্তা টিকা রাম পোখারেল জানিয়েছেন, ওই সময় সীমান্ত এলাকায় কয়েকশ মানুষ অপেক্ষা করছিলেন।
তিনি বলেন, অনেক যাত্রী নেপালের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর চীনের সীমান্ত দফতরে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু বন্যার স্রোত আছড়ে পড়ার পর তাঁদের অনেকের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাঁর নিজের সহকর্মীদের মধ্যেও কয়েকজন নিখোঁজ হয়েছেন।
বিপর্যয়ের উৎস হিসেবে বিশেষজ্ঞরা হিমবাহ ধস থেকে তৈরি ভয়াবহ ধস ও কাদার স্রোতকে দায়ী করছেন। পাহাড়ের ওপর থেকে বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল স্তর নেমে এসে নদীর গতিপথ বদলে দেয় এবং কয়েক কিলোমিটারজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
উদ্ধারকারীরা বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ধ্বংস হওয়া সড়ক এবং নতুন ভূমিধসের আশঙ্কার কারণে অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। চীন ও নেপাল দুই দেশেই চলছে উদ্ধার অভিযান। সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের খোঁজ করছেন উদ্ধারকারীরা।
এই বিপর্যয় শুধু একটি সীমান্ত এলাকার ধ্বংস নয়, এটি হিমালয়ের বদলে যাওয়া প্রকৃতির এক ভয়াবহ সতর্কবার্তাও। যে পথে প্রতিদিন মানুষ নতুন যাত্রার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতেন, সেই পথেই এখন চলছে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের খোঁজ। পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে এখনও ভেসে আসছে একটাই প্রশ্ন, সেদিনের সেই কয়েক মিনিটে আর কত জীবন হারিয়ে গেল?







