বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি ইউরোপে
ইউক্রেনের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সংঘাতের শঙ্কা

ছবি: এআই
ইউক্রেন যুদ্ধের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে ইউরোপের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে— এমন আশঙ্কায় প্রস্তুতি জোরদার করছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশের সাম্প্রতিক সামরিক মহড়া, ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে সম্ভাব্য নাশকতা এবং সীমিত পরিসরের সামরিক অভিযানের আশঙ্কা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
সিএনএনের আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশ্লেষক ব্রেট এইচ ম্যাকগার্কের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীতে প্রায় একই সময়ে নেওয়া একাধিক পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, ইউক্রেনের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর সংঘাতের সম্ভাবনাকে এখন আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ইউরোপীয় সরকারগুলো। তবে এর অর্থ রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ অনিবার্য— এমনটি নয়। বরং সীমিত সামরিক পদক্ষেপ, নাশকতা, সাইবার হামলা কিংবা এমন কর্মকাণ্ডের আশঙ্কাই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
সুয়ালকি করিডর ঘিরে উদ্বেগ
রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশ সম্প্রতি পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকায় বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়েছে। মহড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েছে সুয়ালকি করিডরের কাছাকাছি এলাকায়। প্রায় ১০৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ভূখণ্ড পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী এলাকা এবং বাল্টিক অঞ্চলের দেশ লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে ন্যাটোর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত করেছে। ফলে সামরিক পরিকল্পনায় এ অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, রাশিয়া চাইলে বেলারুশকে সঙ্গে নিয়ে এই অঞ্চলে সীমিত সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এমন পদক্ষেপ সরাসরি কোনো ন্যাটো সদস্যদেশে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের রূপ না-ও নিতে পারে। কিন্তু তাতে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
নাশকতা ও সাইবার হামলাও বড় আশঙ্কা
ইউরোপের উদ্বেগ শুধু প্রচলিত যুদ্ধের সম্ভাবনাকে ঘিরে নয়। সাইবার হামলা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, চালকবিহীন উড়োজাহাজের ব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার মতো কর্মকাণ্ড নিয়েও সতর্কতা বাড়ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অনেক সময় যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যবর্তী ধূসর ক্ষেত্রের কার্যক্রম হিসেবে দেখা হয়। এর বৈশিষ্ট্য হলো— হামলার সঙ্গে কোনো রাষ্ট্রের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে এবং তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা সৃষ্টি হয়।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে চালকবিহীন উড়োজাহাজ বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সেটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে, লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় বেলারুশের দিক থেকে প্রবেশ করা একটি চালকবিহীন উড়োজাহাজ ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও ইউরোপের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনের প্রস্তুতি
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গোপনীয় নিরাপত্তা বৈঠক করেছেন। পরে তিনি ইউরোপ ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের স্থাপনাগুলো আরও সুরক্ষিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
জার্মানিতেও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক আহত মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাব্যবস্থা কীভাবে সচল রাখা যাবে, সে বিষয়েও পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ব্রিটেন সাধারণ নাগরিকদেরও জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন খাবার ও পানীয়জল মজুদ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা নেতৃত্বও বর্তমান সময়কে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়গুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
যুদ্ধের প্রস্তুতি শুধু অস্ত্রভাণ্ডারে নয়
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে ইউরোপের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো— আধুনিক যুদ্ধে শুধু ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই হয় না। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা, হাসপাতালগুলো বিপুলসংখ্যক আহত মানুষের চিকিৎসার উপযোগী করা, বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা, পরিবহনব্যবস্থা সচল রাখা এবং দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে সরকারি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই ন্যাটো ২০২৬ সালের জন্য জাতীয় স্থিতিস্থাপকতার নতুন কিছু মানদণ্ড প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকার পরিচালনার ধারাবাহিকতা, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা, চিকিৎসাব্যবস্থা এবং যোগাযোগব্যবস্থা সংকট বা সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যেও সচল রাখার প্রস্তুতি। ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতাও এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডও বদলাচ্ছে নিরাপত্তা পরিকল্পনা
ইউরোপের ঐতিহ্যগতভাবে নিরপেক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ডও নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে। এতে জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো, সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলা এবং প্রয়োজন হলে দেশকে সুরক্ষিত করার সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরাসরি প্রচলিত সামরিক হামলার আশঙ্কা আপাতত কম বলে দেশটি মনে করলেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা চালকবিহীন উড়োজাহাজের হামলার মতো ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ইউরোপের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পোল্যান্ডে স্থায়ী মার্কিন সেনাঘাঁটি স্থাপনের বিষয়ে অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন। একই সময়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান জন র্যাটক্লিফ মস্কো সফর করে ন্যাটোর ভূখণ্ডে হামলা না চালানোর বিষয়ে রাশিয়াকে সতর্ক করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইউরোপের উদ্বেগের একটি অংশ হলো, বড় ধরনের একাধিক আন্তর্জাতিক সংকট একই সময়ে দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সম্পদ ও মনোযোগ কতটা দ্রুত ইউরোপে কেন্দ্রীভূত করতে পারবে। আকাশ প্রতিরক্ষা, নৌবাহিনী, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং গোলাবারুদের মজুদ— সবক্ষেত্রেই একসঙ্গে একাধিক অঞ্চলের চাহিদা সামলানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
ইউরোপের বর্তমান প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধ শুরু করা নয়; বরং সম্ভাব্য আগ্রাসন বা নাশকতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজকে অচল হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা। ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে বিদ্যুৎ, পানি, হাসপাতাল, যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা সচল রাখা রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাম্প্রতিক তৎপরতা থেকে বোঝা যায়, ইউক্রেন যুদ্ধ আর শুধু ইউক্রেনের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না— সে প্রশ্নটি ইউরোপের নিরাপত্তা পরিকল্পনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট, এসব প্রস্তুতি রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী— এমন প্রমাণিত বিষয় নয়। বরং ইউরোপীয় দেশগুলো সম্ভাব্য সীমিত সামরিক পদক্ষেপ, নাশকতা ও অন্যান্য অনিশ্চিত পরিস্থিতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে।
তথ্যসূত্র: ব্রেট এইচ ম্যাকগার্ক, সিএনএন (পলিটিকস)




