চার্লস বলেছিলেন ‘ভুলে যাবে বিশ্ব'
এখনো মানুষ কাঁদে ডায়ানার জন্য
- সময় পেরিয়েছে, রাজা বদলেছে, প্রজন্মও বদলেছে। কিন্তু ‘পিপলস প্রিন্সেস’-এর নাম উঠলেই আজও ফিরে আসে ১৯৯৭ সালের সেই শোক
- ডায়ানার মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর ভাই আর্ল স্পেন্সারের বিস্ফোরক দাবি। তার ভাষ্য, শেষকৃত্য নিয়ে তর্কের সময় তৎকালীন প্রিন্স চার্লস বলেছিলেন, মানুষ শিগগিরই ডায়ানাকে ভুলে যাবে। ইতিহাস যেন সে কথার উল্টো সাক্ষ্যই দিচ্ছে

সংগৃহীত ছবি
আসে মানুষ যায় চলে! কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যায়! অমর হয়ে থাকে পৃথিবীর স্মৃতিতে। অনুভূতিতে জেগে থাকে তার অনুপস্থিতি! প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর আজ তিন দশক পরও সে দৃশ্যই চোখে পড়ে ব্রিটিশ জনপদে। রাজা বদলেছেন, রাজপরিবারে এসেছে নতুন প্রজন্ম, উইলিয়াম ও হ্যারি এখন মধ্যবয়সী পুরুষ। বহুবার বদলে গেছে লন্ডনের সেই রাস্তাগুলোও। শুধু একটি নাম যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে— ডায়ানা।
১৯৯৭ সালের সেই আগস্টের শেষ রাতের পর প্রায় ৩০ বছর কেটে গেছে। তবু তার ছবি দেখলে আজও অনেক ব্রিটিশের মনে ফিরে আসে কেনসিংটন প্রাসাদের সামনে ফুলের সমুদ্র, নির্বাক মানুষের সারি আর একটি অসমাপ্ত জীবনের শোক। অথচ ডায়ানার ভাই আর্ল স্পেন্সারের নতুন দাবি সত্য হলে, তার মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই তৎকালীন প্রিন্স চার্লস নাকি বলেছিলেন, মানুষ তাকে ‘খুব শিগগির’ ভুলে যাবে। সেই কথিত বাক্যই এখন আবার ব্রিটিশ রাজপরিবারের বহু পুরনো ক্ষত খুলে দিয়েছে।
আর্ল স্পেন্সার তার নতুন স্মৃতিকথা ‘সোয়ান সং: ডায়ানা, মাই সিস্টার’ বইয়ে সেই ফোনালাপের কথা লিখেছেন। তার দাবি, ডায়ানার শেষকৃত্যের আয়োজন নিয়ে তীব্র মতবিরোধের সময় চার্লস তাকে বলেছিলেন, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা তাকে খুব শিগগির ভুলে যাব।’ কথোপকথনের পেছনে ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রশ্ন। ডায়ানার দুই ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারি কি মায়ের কফিনের পেছনে হাঁটবেন?
১৯৯৭ সালে ডায়ানার মৃত্যুর সময় উইলিয়ামের বয়স মাত্র ১৫, হ্যারির ১২ বছর। স্পেন্সারের দাবি, এত কম বয়সে দুই ছেলেকে কোটি মানুষের সামনে মায়ের কফিনের পেছনে হাঁটানো উচিত নয় বলেই তিনি মনে করেছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, ডায়ানা বেঁচে থাকলে তিনিও ছেলেদের এমন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে চাইতেন না। রাজপ্রাসাদের পরিকল্পনা অবশ্য বদলায়নি। শেষ পর্যন্ত উইলিয়াম ও হ্যারি তাদের বাবা চার্লস, দাদা প্রিন্স ফিলিপ এবং মামা স্পেন্সারের সঙ্গে ডায়ানার কফিনের পেছনে হাঁটেন। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসে সে দৃশ্য পরে হয়ে ওঠে সবচেয়ে বেদনাবিধুর ছবিগুলোর একটি। মাথা নিচু করে হাঁটছে দুই কিশোর, সামনে তাদের মায়ের কফিন।
স্পেন্সারের বক্তব্য, এ সিদ্ধান্ত নিয়েই চার্লসের সঙ্গে তার ফোনে প্রচণ্ড তর্ক হয়েছিল।
গত শুক্রবার বিবিসির সাংবাদিক লরা কুয়েন্সবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পেন্সার বলেছেন, চার্লসের সঙ্গে তার জীবনে মাত্র দুবার ফোনে কথা হয়েছে। ডায়ানার মৃত্যুর পরের সেই কথোপকথন তিনি এখনো পরিষ্কারভাবে মনে করতে পারেন। তার দাবি, চার্লসের মন্তব্যটি এতটাই বিস্ময়কর ছিল যে, ঘটনার পর তিনি পরিবারের সদস্য এবং কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকেও তা জানিয়েছিলেন। স্পেন্সার নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসেননি। তার ভাষ্য, ‘আমি সত্য বলছি। ঠিক এ শব্দগুলোই তিনি বলেছিলেন।’
বাকিংহাম প্রাসাদ অবশ্য সেই স্মৃতির নির্ভুলতাকেই প্রশ্ন করেছে। প্রাসাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘ভাইয়ের শোকের যন্ত্রণা কখনো কখনো যুক্তি, বিচারবোধ ও স্মৃতিকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যা অন্যরা বুঝতে পারেন না।’
অর্থাৎ স্পেন্সারের দাবি সরাসরি ‘মিথ্যা’ বলা হয়নি; কিন্তু তিন দশক আগের শোকের মুহূর্তে তার স্মৃতি কতটা নির্ভুল, সে প্রশ্ন সামনে এনেছে রাজপরিবার।
তবে ডায়ানাকে মানুষ ভুলেছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কোনো স্মৃতিকথার প্রয়োজন হয় না। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট প্যারিসের পঁ দ্য লালমা সুড়ঙ্গে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান ডায়ানা। তার সঙ্গে নিহত হন প্রেমিক দোদি আল-ফায়েদ ও গাড়িচালক অঁরি পল। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর ব্রিটেন যেন কয়েক দিনের জন্য থমকে গিয়েছিল। কেনসিংটন প্রাসাদের সামনে জমতে থাকা ফুল একসময় এমন উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে, তার সামনে দিয়ে হাঁটার পথও সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ প্রকাশ্যে কেঁদেছিলেন।
ডায়ানার জন্য সেই শোকের কারণ শুধুই তার রাজকীয় পরিচয় ছিল না।
রাজপরিবারের প্রচলিত দূরত্ব ভেঙে মানুষের কাছে পৌঁছেছিলেন তিনি। এমন সময়ে এইডস আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে খালি হাতে করমর্দন করেছিলেন, যখন রোগটি সম্পর্কে ভয় ও ভুল ধারণা ছিল ব্যাপক। স্থলমাইনবিরোধী প্রচারে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় হেঁটেছিলেন। অসুস্থ শিশুদের কোলে নিয়েছেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে মানুষের স্পর্শকেই নিজের সবচেয়ে বড় পরিচিত করেছিলেন।
সে কারণেই একসময় তিনি হয়ে ওঠেন ‘পিপলস প্রিন্সেস’, মানুষের রাজকুমারী। চার্লসের সঙ্গে তার সম্পর্কও ছিল ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি। ১৯৮১ সালে তাদের বিয়ে হয়েছিল। রূপকথার মতো সেই বিয়ের আড়ালে সম্পর্কের টানাপড়েন ক্রমেই প্রকাশ্যে আসে। ১৯৯৬ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তার মাত্র এক বছর পর ডায়ানার আকস্মিক মৃত্যু ব্রিটিশ রাজপরিবারকে এমন এক জনরোষ ও শোকের সামনে দাঁড় করায়, যা আধুনিক রাজতন্ত্র আগে খুব কমই দেখেছিল।
তার মৃত্যু ঘিরে বহু জল্পনা, তদন্ত, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এসেছে এবং মিলিয়েও গেছে। কিন্তু ডায়ানার প্রতি মানুষের আগ্রহ যায়নি। বই লেখা হয়েছে, তথ্যচিত্র হয়েছে, চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিক তৈরি হয়েছে, তার দুই ছেলে বারবার প্রকাশ্যে মায়ের স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন।
আর এখানেই চার্লসের কথিত মন্তব্যটির সবচেয়ে গভীর বৈপরীত্য।
যদি সত্যিই তিনি বলেছিলেন, ডায়ানাকে মানুষ দ্রুত ভুলে যাবে, তবে সময় যেন প্রায় নিষ্ঠুরভাবেই সেই পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করেছে।
চার্লস এখন রাজা। উইলিয়াম ভবিষ্যৎ রাজা হওয়ার পথে। হ্যারি রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক জীবন ছেড়েছেন। ডায়ানার মৃত্যুর পর জন্ম নেওয়া একটি প্রজন্মও এখন প্রাপ্তবয়স্ক।
তবু ডায়ানা যেন এখনো ১৯৯৭ সালের সেই বয়সেই দাঁড়িয়ে আছেন। সেই মোহময় হাসি যেন বৃষ্টিভেজা ভোরে ময়ূরের প্রথম পেখম মেলা, আর সেই চোখ যেন স্বর্গপাখির ডানায় লুকিয়ে থাকা অনন্ত নীলের রহস্য। ভালোবাসা পাওয়ার আকুলতা, প্রেমকে শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে থাকার সাহস আর অসমাপ্ত জীবনের বিষণ্ণতা মিলিয়ে ডায়ানা যেন আজও সময়ের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা এক দুর্লভ সৌন্দর্য।
রাজকীয় আভিজাত্যের আড়ালে তিনি ছিলেন রক্ত-মাংসের এক নারী। প্রেমে পড়েছেন, ভেঙেছেন, আবারও ভালোবাসার উষ্ণতা খুঁজেছেন। সেই অসমাপ্ত প্রেম, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা আর হঠাৎ থেমে যাওয়া জীবনই হয়তো তাকে আজও মানুষের স্মৃতিতে এত জীবন্ত, এত কাছের, এত রহস্যময় করে রেখেছে।
তিন দশক পরও তার নাম উচ্চারিত হলে ব্রিটেনের স্মৃতিতে ফিরে আসে ফুলে ঢাকা প্রাসাদের ফটক, দুই কিশোরের নতমাথা আর এক সেপ্টেম্বরের দীর্ঘ শোক।
মানুষ তাকে ভুলে গেছে কি না, তার উত্তর হয়তো ইতিহাস এরই মধ্যে দিয়ে দিয়েছে।



