ফের কেন সোমালিয়া উপকূলে বাড়ছে জলদস্যুদের হামলা

ছবি: রয়টার্স
সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের হামলা এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে করে তুলছে আরও খারাপ।
এএফপির জাতিসংঘের তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ওই অঞ্চলে জাহাজে অন্তত ১৫টি জলদস্যু হামলার খবর পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে এমন হামলার সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচটি। ২০১৩ সালের পর কোনো পুরো বছরেই এই সংখ্যা এত বেশি ছিল না।
রয়্যাল নেভির হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি। তাদের হিসাবে, আগস্টের শেষ দিকের আগের ছয় মাসে এমন ২৫টি ঘটনা ঘটেছে।
এরই মধ্যে কয়েকটি হামলা সফল জাহাজ ছিনতাইয়ে রূপ নিয়েছে। গত মাসে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে দুটি জাহাজ ছিনতাই করা হয়। সম্প্রতি একটি জাহাজের নাবিকদের উদ্ধার করা হলেও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, তখনও পাঁচটি জাহাজ ও ৮৭ জন নাবিক জলদস্যুদের হাতে জিম্মি ছিলেন। তাদের মুক্তির বিনিময়ে জলদস্যুরা লাখ লাখ ডলার মুক্তিপণ দাবি করছে।
আফ্রিকাভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ক্যাস্টর ভ্যালির তথ্য অনুযায়ী, সোমালিয়ার উপকূলে অন্তত তিনটি পৃথক জলদস্যু গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এসব গোষ্ঠী স্পিডবোট ও রকেটচালিত গ্রেনেডসহ বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত সশস্ত্র সদস্য ব্যবহার করে।
কিছু গোষ্ঠী ছিনতাই করা জাহাজকেও ভাসমান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে। এসব জাহাজকে ‘মাদারশিপ’ বলা হয়। দ্য আইপেপারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ফলে জলদস্যুরা সোমালিয়ার উপকূল থেকে অনেক দূরে যেতে এবং উপকূল থেকে শত শত মাইল দূরে থাকা জাহাজেও হামলা চালাতে পারছে।
গত ১৭ আগস্ট সোমালিয়ার উপকূলে তুরস্কের একটি কার্গো জাহাজে হামলার সময় জাহাজটিতে মাত্র দুজন নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। ছয়জন সশস্ত্র জলদস্যু জাহাজে উঠে তাদের পরাস্ত করে। এরপর ১০ জনকে জিম্মি করে কয়েক মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণ দাবি করে তারা। পরে তুরস্ক ও সোমালিয়ার যৌথ অভিযানে জিম্মিদের উদ্ধার করা হয়। এ সময় কয়েকজন জলদস্যু নিহত হন।
জলদস্যুদের তৎপরতা নতুন করে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর উপস্থিতি কমে যাওয়া। সোমালিয়ায় যখন জলদস্যুদের তৎপরতা তুঙ্গে ছিল, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো ও অন্যান্য বহুজাতিক নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে ব্যাপকভাবে মোতায়েন ছিল। এর ফলে জলদস্যু হামলার সংখ্যা ২০১১ সালের সর্বোচ্চ ২৩৭টি থেকে কমে ২০১৩ সালে মাত্র ১৫টিতে নেমে আসে।
কিন্তু এখন আবার ওই অঞ্চলে নৌবাহিনীর উপস্থিতি কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপারেশন আটালান্টায় বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ বর্গমাইল এলাকায় মাত্র এক থেকে তিনটি যুদ্ধজাহাজ দায়িত্ব পালন করছে।
অপারেশনটির কমান্ডার মে মাসে সতর্ক করে বলেছিলেন, ৪৭টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত কম্বাইন্ড মেরিটাইম ফোর্সেসের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় জলদস্যুবিরোধী তৎপরতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাহরাইনে থাকা এই বাহিনীর ঘাঁটিও ইরানের ব্যাপক হামলার শিকার হয়েছে। এদিকে ভারতীয় নৌবাহিনীও তাদের কিছু সম্পদ হরমুজ প্রণালীর দিকে সরিয়ে নিয়েছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের সোমালিয়া শাখার প্রধান মোস্তফা এলবানা বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীগুলোর মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিয়েছে।
টিম ওয়াকার বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ইরানের সঙ্গে তাদের সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। সমুদ্রপথের নিরাপত্তার প্রধান জোগানদাতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই অঞ্চলে টহল দিতে চাওয়া অন্যান্য দেশকেও জাহাজ ও সহায়তা দিত তারা। এখন সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে গেছে।’
লন্ডনের কিংস কলেজের নৌবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলেসিও পাটালানো জানান, এডেন উপসাগরের আশপাশে জাহাজের চলাচল ধীর হয়ে যাওয়ায় জলদস্যুদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বললেন, ‘ভারত মহাসাগরে, অথবা বাব আল-মান্দাবের কাছে, কিংবা ওমানের কাছাকাছি বিপুলসংখ্যক জাহাজ অলস পড়ে থাকা জলদস্যুদের জন্য এমন একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে, যা তারা হাতছাড়া করতে চায়নি।’
সম্প্রতি পুন্টল্যান্ডের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের মিত্র হুতিরা সোমালিয়ার জলদস্যুদের সরঞ্জাম ও ছোট অস্ত্র সরবরাহ করেছে।
ওয়াকার বলেছেন, ইরানের যুদ্ধ যদি চলতেই থাকে, তাহলে অক্টোবরের পর আরও হামলা হতে পারে।
তিনি আরও বললেন, ‘ইরানে যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ওই অঞ্চলের সামগ্রিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা তত কমে যাবে।’
সূত্র: এনডিটিভি






