সোমালিয়ার উপকূলে ফিরে এসেছে জলদস্যুরা
- ফাঁকা হচ্ছে সোমালি উপকূলের নজরদারি
- চলতি বছর একের পর এক জাহাজ ছিনতাই
- জুলাইয়ের শেষেও চার জাহাজসহ ৬৭ নাবিক জলদস্যুদের কব্জায়

হরমুজ ও লোহিত সাগরমুখী সংঘাতে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক নৌবাহিনী
একদিকে ইরান যুদ্ধের আগুনে উত্তপ্ত হরমুজ প্রণালি, অন্যদিকে ইয়েমেনের হুতি হামলার ভয়ে অস্থির লোহিত সাগর। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর যুদ্ধজাহাজ যখন এই দুই জলপথ সামলাতে ব্যস্ত, তখন কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে যেন পুরনো একটি ভয় আবার মাথা তুলছে। সোমালিয়ার উপকূলে ফিরে এসেছে জলদস্যুরা। কখনো তেলের ট্যাংকার, কখনো সারবাহী জাহাজ, আবার কখনো ছোট মাছ ধরার নৌযান ছিনতাই করে সেগুলোকেই ‘মাদারশিপ’ বানিয়ে আরও দূরের জাহাজে হানা দিচ্ছে তারা। সমুদ্রের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরান যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর অন্যতম হয়ে উঠতে পারে সোমালি জলদস্যুতার এই প্রত্যাবর্তন।
২০২৬ সালের শুরু থেকেই বিপদের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। তবে মার্চের শেষ থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলায়। ২৪ মার্চ সোমালি জলদস্যুরা রাজধানী মোগাদিসুর প্রায় ৪০০ নটিক্যাল মাইল পূর্বে ইরানের পতাকাবাহী ‘আলওয়াসেমি ৭৮৬’ নামের একটি ধাও ছিনতাই করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলদস্যুবিরোধী নৌ-অভিযান ‘অপারেশন আটালান্টা’র মতে, ছোট জাহাজটিকে পরে বড় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য মাদারশিপ হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। কয়েক দিনের অভিযানের পর সেটি মুক্ত করা হয়।
কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি। ২১ এপ্রিল সোমালিয়ার উত্তর উপকূলের কাছে পালাউয়ের পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাংকার অনার ২৫ ছিনতাই হয়। পাঁচ দিন পর, ২৬ এপ্রিল, মোম্বাসাগামী সোয়ার্ড নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ দখলে নেয় জলদস্যুরা। সেটিতে সার পরিবহন করা হচ্ছিল। ২ মে ইয়েমেনের শাবওয়া প্রদেশের কানা বন্দরের কাছে নোঙর করা টোগোর পতাকাবাহী ইউরেকা ট্যাংকারও ছিনতাই হয়। এরপর ১৭ জুলাই ইয়েমেনের মুকাল্লা থেকে প্রায় ৬৫ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে তানজানিয়ার পতাকাবাহী আসানা ট্যাংকার দখল করে জলদস্যুরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপারেশন আটালান্টার সর্বশেষ প্রকাশ্য হিসাব, ২৯ জুলাই পর্যন্ত ওই চারটি জাহাজই সোমালিয়ার উত্তর উপকূলের অদূরে জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সব মিলিয়ে ৬৭ জন নাবিক তখন বন্দি ছিলেন। অনার ২৫-এর অধিকাংশ নাবিক পাকিস্তানি, সোয়ার্ডের বেশিরভাগ সিরীয়, ইউরেকার ১২ জনের মধ্যে আটজন মিসরীয় এবং আসানার ২২ নাবিকের প্রায় অর্ধেক ভারতীয়।
এই সংখ্যা শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার ছবি নয়। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা আইএমও জানিয়েছে, এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে লোহিত সাগর ও গালফ অব এডেন অঞ্চলে জলদস্যুতা ও সশস্ত্র ডাকাতির ২৪টি চেষ্টা বা সফল ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্ব জুড়ে এমন ঘটনার সংখ্যাও ১৪৬ থেকে বেড়ে ১৭১ হয়েছিল।
ইরান যুদ্ধের সঙ্গে যোগ কোথায়
জলদস্যুরা অবশ্য ইরান যুদ্ধের সৃষ্টি নয়। সোমালিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য, উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্বল আইনশৃঙ্খলা, অবৈধ বিদেশি মাছ ধরা এবং মুক্তিপণের বিপুল অর্থ সবই বহু বছর ধরে এই অপরাধের পেছনে কাজ করেছে। কিন্তু চলতি বছরের আঞ্চলিক যুদ্ধ তাদের সামনে নতুন সুযোগ খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি হয়ে ওঠে সংঘাতের প্রধান কেন্দ্রগুলোর একটি। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা ও পাল্টা সামরিক অভিযানে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবেও নিরাপত্তার প্রয়োজন বেড়ে যায়। ফলে সোমালি উপকূলে জলদস্যুবিরোধী টহলে ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক নৌসম্পদের একটি অংশকে অন্য জায়গায় মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ইউরোপীয় নৌবাহিনীও স্বীকার করেছে, হরমুজ সংকটসহ আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা নতুন করে জলদস্যুতা বাড়াতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে।
এই সুযোগটি জলদস্যুরাও দ্রুত বুঝেছে। আগে উপকূলের কাছাকাছি ছোট নৌকায় হামলাই ছিল তাদের পরিচিত কৌশল। এখন তারা প্রথমে একটি ধাও বা বাণিজ্যিক জাহাজ দখল করছে, তারপর সেটিকে সমুদ্রে দীর্ঘ সময় অবস্থানের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। সেখান থেকে ছোট দ্রুতগতির নৌকা নামিয়ে শত শত নটিক্যাল মাইল দূরেও নতুন লক্ষ্য খোঁজা সম্ভব হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, জিপিএস এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র।
জুলাইয়ের শুরুতে গোল্ডেন আর্সেনাল নামের একটি বাল্ক ক্যারিয়ার সোমালিয়ার বোসাসো থেকে প্রায় ১১০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে হামলার মুখে পড়ে। হামলাকারীদের কাছে অ্যাসল্ট রাইফেলের পাশাপাশি রকেটচালিত গ্রেনেডও ছিল বলে জানায় অপারেশন আটালান্টা। বহুজাতিক নৌ সমন্বয়ের মাধ্যমে জাহাজটি শেষ পর্যন্ত নিরাপদে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কাছাকাছি এলাকায় আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার চেষ্টাও হয়েছিল।
যুদ্ধ বদলাচ্ছে জাহাজের পথও
ইরান যুদ্ধ জলদস্যুদের আরেকটি সুবিধা দিয়েছে, মানে বাণিজ্যিক জাহাজের পথ বদলে যাচ্ছে।
হরমুজের সংকট এবং লোহিত সাগরে হুতি হামলার ঝুঁকিতে বহু জাহাজ স্বাভাবিক পথ এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করছে। জুলাইয়ের শেষে হুতিদের হুমকির পর ছয়টি সৌদি সুপারট্যাংকার গালফ অব এডেন থেকে দিক ঘুরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে চলে যায়। ফলে সোমালিয়ার দীর্ঘ ভারত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছাকাছি দিয়ে চলা জাহাজের সংখ্যা ও সম্ভাব্য লক্ষ্য উভয়ই বাড়ছে।
সমস্যা আরও বাড়িয়েছে জ্বালানির দাম। যুদ্ধের কারণে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও স্থানীয় সামুদ্রিক পুলিশের টহল চালানোর খরচও বেড়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইয়ান রালবি চলতি বছর সতর্ক করেছিলেন, জ্বালানির উচ্চ দাম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল দেওয়ার সামর্থ্য কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধজাহাজ কোথায় মোতায়েন হচ্ছে, সেটিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমুদ্রে একটি টহল নৌকা কত ঘণ্টা চলতে পারবে, সেই হিসাবেও পৌঁছে যাচ্ছে।
একসময় প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল জলদস্যুরা
২০০০-এর দশকের শেষ দিকে ‘সোমালি জলদস্যু’ নামটি বিশ্ববাণিজ্যের আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল। ২০০৫ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সোমালি জলদস্যুরা এক হাজারের বেশি হামলা চালিয়েছিল, সফলভাবে ছিনতাই করেছিল ২১৮টি জাহাজ এবং তিন হাজার সাত শর বেশি নাবিককে জিম্মি করেছিল। বছরে প্রায় পাঁচ কোটি ডলার পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় হতো; নিরাপত্তা, বীমা, পথ বদল ও বাণিজ্য ক্ষতি মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ কোনো কোনো হিসাবে বছরে ১৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
এরপর আন্তর্জাতিক নৌ-টহল, জাহাজে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী, দ্রুতগতিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পার হওয়া এবং সোমালিয়ার উপকূলে স্থানীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার ফলে জলদস্যুতা নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
কিন্তু অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি। তাদের অর্থদাতা, দালাল, মুক্তিপণ আলোচনাকারী ও স্থলভিত্তিক সহায়তাকারীদের অনেকেই থেকে যায়। এখন নিরাপত্তার ফাঁক তৈরি হতেই পুরনো ব্যবসার কাঠামো আবার সক্রিয় হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দারিদ্র্যও ঠেলে দিচ্ছে সমুদ্রের অপরাধে
সব দায় অবশ্য যুদ্ধের নয়। সোমালিয়ার ভেতরের সংকট আরও গভীর। বিদেশি সহায়তা কমেছে, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়েছে, উপকূলীয় জীবিকা দুর্বল এবং রাজনৈতিক বিরোধও তীব্র। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র সোমালিয়াকে প্রায় ৪৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার মানবিক সহায়তা দিলেও পরের বছর তা নেমে আসে প্রায় সাত কোটি ডলারে; ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে মার্কিন সরকারের সহায়তা ছিল প্রায় ৩০ লাখ ডলার।
অন্যদিকে সোমালিয়ার অনেক উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বিদেশি জাহাজ তাদের জলসীমায় অবৈধভাবে মাছ ধরে স্থানীয় জেলেদের জীবিকা নষ্ট করছে। জলদস্যুতা কোনোভাবেই সেই সমস্যার বৈধ সমাধান নয়, তবে স্থানীয় অর্থনীতির দুর্বলতা তরুণদের অপরাধী গোষ্ঠীর জন্য সহজ লক্ষ্য বানায়। বিশেষজ্ঞ জেথ্রো নরম্যান সতর্ক করেছেন, জলদস্যুদের মুক্তিপণের অর্থ অল্প কিছু পরিবারের কাছে স্বল্পমেয়াদি আয় আনতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর মূল্য দিতে হয় পুরো অঞ্চলের মানুষকে–আমদানি করা খাবার ও জ্বালানির দাম বাড়ে, বৈধ মাছ ধরা বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিদেশি সামরিক উপস্থিতিও বাড়ে।
এই সংকট বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর বাণিজ্যিক অর্থনীতির কাছেও একেবারে দূরের ঘটনা নয়। গালফ অব এডেন ও বাব আল-মান্দেব হয়ে সুয়েজ খাল এশিয়া ও ইউরোপের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যপথ। এই পথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে জাহাজকে দীর্ঘ পথ ঘুরতে হয়, সঙ্গে বাড়ে বীমা, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দামের মধ্য দিয়েই আমদানিকারক দেশগুলোর বাজারে পৌঁছাতে পারে, এটি বর্তমান পথবদল ও যুদ্ধঝুঁকির স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিণতি।
ইরান যুদ্ধের মানচিত্রে সোমালিয়া হয়তো কোনো প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র নয়। সেখানে মার্কিন বা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র পড়ছে না। কিন্তু যুদ্ধ যখন নৌবাহিনীকে এক সমুদ্র থেকে আরেক সমুদ্রে টেনে নেয়, জাহাজকে পুরনো পথ ছাড়তে বাধ্য করে এবং নিরাপত্তার পাহারায় ফাঁক তৈরি করে, তখন সেই ফাঁকেই ফিরে আসে বহু বছর আগের অপরাধ।
হরমুজে যুদ্ধের ঢেউ উঠেছে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে। অথচ তার দোলা এসে লাগছে সোমালিয়ার উপকূলেও। সেখানে বন্দুক হাতে অপেক্ষা করছে এমন এক পুরনো শত্রু, যাকে বিশ্ব একসময় প্রায় পরাজিত ভেবেছিল। ইরান যুদ্ধ শুধু নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করছে না, কোথাও কোথাও পুরনো বিপদকেও আবার জীবিত করে তুলছে।






