যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার মুখে আফ্রিকার নতুন মানচিত্র জাতিসংঘে অনুমোদন

জাতিসংঘে অনুমোদিত ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্রে আফ্রিকাকে আগের চেয়ে তুলনামূলক বড় দেখা যাচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত
আফ্রিকা মহাদেশকে তুলনামূলকভাবে আরও সঠিক আকারে দেখতে বিশ্বমানচিত্র পরিবর্তনের প্রস্তাবে সায় দিয়েছে জাতিসংঘ।
শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাবটি ১৬৪ ভোটে পাস হয়েছে। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে শুধু যুক্তরাষ্ট্র। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।
টোগো এ প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। আফ্রিকান ইউনিয়নের সকল সদস্য এতে সমর্থন জানায়। এই প্রস্তাবে ২০১৮ সালে তৈরি ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র ব্যবহারের কথা বলা হয়।
তবে প্রস্তাবটি পাস হলে এটি বাধ্যতামূলক হচ্ছে না। অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে সব প্রতিষ্ঠানকে নতুন মানচিত্র ব্যবহার করতেই হবে, এমন কোনো নির্দেশ নেই।
বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মানচিত্রগুলোর একটি হলো ১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটরের তৈরি মানচিত্র। সমুদ্রপথে নৌযান চলাচলের সুবিধার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল। তবে এতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তন সঠিকভাবে তুলে ধরা হয় নাই।
মার্কেটর মানচিত্রে বিষুবরেখার কাছের অঞ্চলগুলো বাস্তবের তুলনায় ছোট এবং মেরুর কাছের অঞ্চলগুলো বড় দেখায়। ফলে আফ্রিকাকে গ্রিনল্যান্ডের কাছাকাছি আকারের মনে হয়। বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
সমালোচকদের মতে, এই বিকৃতি শুধু মানচিত্রের সমস্যা নয়। এর ফলে আফ্রিকার আয়তন, সম্পদ, জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সম্পর্কে মানুষের ধারণাতেও প্রভাব পড়ে।
এই সমস্যা কমাতে ২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র তৈরি করেন। এতে মহাদেশগুলোর আয়তন তুলনামূলকভাবে বাস্তবের কাছাকাছি দেখানো হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫৪ সদস্যও এই মানচিত্র গ্রহণ করে।
টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসি ভোটের আগে বলেছেন, ‘ন্যায্য বিশ্ব শুরু হয় ন্যায্য মানচিত্র দিয়ে।’
জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘মানচিত্র কখনোই নিরপেক্ষ নয়। এটি মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করে এবং বিশ্বে বিভিন্ন অঞ্চল ও মহাদেশের অবস্থান কীভাবে দেখা হবে, তা নির্ধারণ করে।’
ফ্রান্সও এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল ব্যারো বলেছেন, মানচিত্র পরিবর্তন করলে বিশ্ব বদলে যায় না। তবে বাস্তবতাকে বিকৃত করে এমন মানচিত্র ঠিক করা ‘সত্য প্রতিষ্ঠার একটি পদক্ষেপ’।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। জাতিসংঘে দেশটির প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ বলেছেন, সাধারণ পরিষদের উচিত আন্তর্জাতিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও পারস্পরিক সম্পর্কের মতো প্রকৃত সমস্যায় মনোযোগ দেওয়া।
তার মতে, ষোড়শ শতকের মানচিত্র নিয়ে আলোচনা জাতিসংঘের কাজ ও উদ্দেশ্যকে উপহাসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
আফ্রিকা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আফ্রিকা নো ফিল্টার’-এর লেরাতো মোগাতলেহ বলেছেন, বিশ্বমানচিত্রে আফ্রিকার ভুল উপস্থাপন শুধু মানচিত্র তৈরির ভুল নয়, এটি একটি ধারণাগত সমস্যাও। তার মতে, এর মাধ্যমে আফ্রিকা সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা আরও শক্ত হয়েছে।
কেনিয়ার ভূগোলবিদ কিওকো মুয়েন্দোও বলেছেন, মানচিত্র শুধু পথ দেখানোর মাধ্যম নয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোনো অঞ্চলকে মানুষ কীভাবে দেখবে, মানচিত্র সেটিকেও প্রভাবিত করে।
জাতিসংঘের এই প্রস্তাব বাধ্যতামূলক না হলেও স্কুল, গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নতুন মানচিত্র ব্যবহার শুরু করলে বিশ্বজুড়ে আফ্রিকার আকার ও অবস্থান সম্পর্কে প্রচলিত ধারণায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র : বিবিসি






