জ্বালানির উচ্চমূল্য, নাইজেরিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল

নাইজেরিয়ার গোম্বেতে বাণিজ্যিক পরিবহনে ব্যবহৃত একটি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল- আলজাজিরা
নাইজেরিয়ার গোম্বে শহরের পান্তামি এলাকায় সকালে রাস্তাজুড়ে মোটরসাইকেলের ব্যস্ততা দেখা যায়। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে ছুটে চলে একের পর এক মোটরবাইক। তবে সম্প্রতি সেই চেনা দৃশ্যের মধ্যে যোগ হয়েছে প্রায় শব্দহীন কিছু মোটরসাইকেল। জলবায়ু নীতির কারণে নয়, বরং জ্বালানির বাড়তি দামের চাপে বদলাচ্ছে শহরটির যাতায়াতব্যবস্থা।
নাইজেরিয়ার রাস্তায় চলাচল করা প্রচলিত পেট্রোলচালিত মোটরসাইকেলের তুলনায় বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল প্রায় শব্দহীন এবং এতে ধোঁয়াও বের হয় না। এক পথচারী জানালেন, তার পেছনে একটি মোটরসাইকেল আসছে বুঝতেই পারেননি। চালক হর্ন দেওয়ার পর বিষয়টি টের পান তিনি।
গোম্বেতে ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ছে। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু জ্বালানি ভর্তুকি তুলে দেওয়ার পর পেট্রোলের দাম বেড়ে যায়। এতে যাতায়াত ও জীবিকার খরচ কমাতে অনেকেই বিকল্প পথ খুঁজছেন।
একটি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের দাম সাধারণত প্রায় ১০ লাখ নাইরা বা ৭৩৫ ডলার। ফলে অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে থাকলেও যারা কিনেছেন, তারা বলছেন জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ অনেক কমেছে।
গোম্বেতে বর্তমানে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম প্রায় ১ হাজার ৩৬৫ নাইরা বা ১ ডলার। ভর্তুকি তুলে নেওয়ার আগে দাম ছিল প্রায় ২০০ নাইরা বা ১৫ সেন্ট। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং চাপে পড়েছে সাধারণ পরিবারের বাজেট।
এর পাশাপাশি পেট্রোলচালিত পুরনো মোটরসাইকেল ও যানবাহনের পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নাইজেরিয়ার শহরগুলোতে বায়ুদূষণের অন্যতম বড় উৎস সড়ক পরিবহন। যানবাহনের ধোঁয়া ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণার মাত্রা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
গোম্বের কৃষক ও বাসিন্দা আয়ুবা আবুবাকারের বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ব্যবহারের শুরু চলতি বছরের শুরুতে। এক বন্ধুর কাছ থেকে এটি সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। মোটরসাইকেলটি কেনার পর তিনি গোম্বে থেকে কুমো যাওয়া-আসা করেন। এতে ব্যাটারির খুব সামান্য চার্জ খরচ হওয়ায় অবাক হন তিনি।
প্রায় তিন মাস ধরে মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করছেন আয়ুবা। পেট্রোলচালিত মোটরসাইকেলের মতো বড় ধরনের যান্ত্রিক সমস্যাতেও এখন পর্যন্ত পড়তে হয়নি তাকে। তিনি বলছেন, ‘একবার স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার না করায় আমার চার্জার পুড়ে গিয়েছিল। এর বাইরে বড় কোনো রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হয়নি।’
তার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে জ্বালানি খরচ বাবদ প্রায় ৫ হাজার নাইরা বা ৩ দশমিক ৭ ডলার সাশ্রয় হচ্ছে।
তবে তার ভাষ্য, ‘এই সাশ্রয় হলেও বেশিরভাগ নাইজেরিয়ানের নাগালের মধ্যে আনতে হলে মোটরসাইকেলটির দাম আরও কমাতে হবে।’
গোম্বের আরেক চালক আহমেদ আমিনু জানিয়েছেন, এখন তাকে ইঞ্জিন তেলের জন্য অর্থ খরচ করতে হয় না। আরেক মালিক ইয়াকুবু সুলে জানান, মূলত শব্দহীন চলাচলের কারণেই তিনি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল বেছে নিয়েছেন।
তবে আগ্রহ বাড়লেও বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের বিস্তারে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ। নাইজেরিয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মিত। অনেক পরিবার দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পায়।
জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সাসটেনার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুবাকারের মতে, ‘শেষ পর্যন্ত যদি জেনারেটর দিয়ে এসব মোটরসাইকেল চার্জ দিতে হয়, তাহলে লাভ কী? আমরা শুধু ধোঁয়ার উৎস মোটরসাইকেলের নিষ্কাশন পাইপ থেকে জেনারেটরের পাইপে সরিয়ে নেব। আবার সেই একই জায়গায় ফিরে যাব।’
তার মতে, বাড়িতে চালকদের মোটরসাইকেল চার্জ দেওয়ার ওপর নির্ভর না করে সৌরবিদ্যুৎচালিত ব্যাটারি বদলকেন্দ্র গড়ে তোলা বেশি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি পুনর্ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি। বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমানো, ব্যাটারি বদলকেন্দ্র পরিচালনাকারীদের সহায়তা, ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের মানদণ্ড তৈরি এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে বৈদ্যুতিক পরিবহনকে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এই মুহূর্তে গোম্বেতে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল এখনো সীমিত পরিসরের বিকল্প। তবে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় এবং ব্যাটারি বদলকেন্দ্রের অবকাঠামো ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকায় শহরের রাস্তায় দেখা দেওয়া এসব মোটরসাইকেল নাইজেরিয়ার পরিবহনব্যবস্থায় অর্থনৈতিক চাপের প্রভাবের একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মুহাম্মদ আবুবাকার বলছিলেন, ‘লাগোস, কানো ও পোর্ট হারকোর্টে প্রতিদিন কত মোটরসাইকেল ধোঁয়া ছড়াচ্ছে তা দেখলেই বোঝা যায়, বায়ুদূষণের মাত্রা কতটা উদ্বেগজনক। বাণিজ্যিক মোটরসাইকেলের বহরের সামান্য অংশ দিয়েও যদি শুরু করা যায়, তাহলে তুলনামূলক দ্রুতই বায়ুর মানের উন্নতি দৃশ্যমান হতে পারে।’







