নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে বড় দুই দলের হিসাব ওলটপালট করতে পারে নতুন নেতৃত্ব

অকল্যান্ডের রকেট পার্কে একটি প্রচার অনুষ্ঠানে অপরচুনিটি পার্টির নেত্রী কিউলে ওং— রয়টার্স
নিউজিল্যান্ডে হতে যাচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচন। ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল জোটের আবারও ক্ষমতায় ফেরার পথ অনিশ্চিত। জনমত জরিপের ইঙ্গিত, রাজনীতিতে নতুন মুখ হিসেবে আবির্ভূত এক মিলিনিয়াল প্রজন্মের নেতা হয়ে উঠতে পারেন সরকার গঠনের নির্ধারক।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে ওয়েলিংটনের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা দুটি দলের— মধ্য-ডানপন্থী ন্যাশনাল পার্টি ও মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির সমর্থন জনমত জরিপে ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ভোটাররা এখন আরও ডানপন্থী, বামপন্থী এবং প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি করা একটি মধ্যপন্থী দলের দিকে ঝুঁকছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, বেকারত্বের উচ্চ হার এবং স্থবির অর্থনীতিতে হতাশ ভোটাররা শনিবারের নির্বাচনে চিরাচরিত পছন্দের বাইরে বিকল্প খুঁজছেন।
নির্বাচনী লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে মধ্যপন্থী অপারচুনিটি পার্টি। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী কিউলে ওং। সাবলীল বক্তা হিসেবে পরিচিত দুই সন্তানের এই মা আগে টেকসই ব্যবসা উন্নয়নবিষয়ক পরামর্শক ছিলেন। সংক্ষেপে তিনি ‘কিউ’ নামে পরিচিত। মাত্র এক বছর আগে রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। দলটির নেতৃত্বের জন্য প্রকাশিত একটি চাকরির বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়েই তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু।
ব্যবসাবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব— দুই পরিচয়েই নিজেদের তুলে ধরছে তার দল। পাশাপাশি কল্যাণ ভাতার পরিবর্তে ভূমি কর ও সর্বজনীন মৌলিক আয় চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। বর্তমান জনমত জরিপ অনুযায়ী, পার্লামেন্টে আসন পেতে প্রয়োজনীয় ৫ শতাংশ ভোটের সীমা পার করার মতো সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে দলটির।
এটি হলে ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বাইরে থাকা কোনো সম্পূর্ণ নতুন দল পার্লামেন্টে প্রবেশের সুযোগ পাবে। ওয়েলিংটনের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটির রাজনীতিবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক লারা গ্রিভসের ভাষায়, এটি হবে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ ঘটনা।
তিনি সিএনএনকে বলেছেন, ‘এ ধরনের ঘটনা আগে প্রায় ঘটেনি বলা চলে। অথচ এর আগে বেশ কয়েকটি দল বিপুল অর্থ ব্যয় করেও এমন চেষ্টা করেছে।’ তার মতে, ‘চলমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় হতাশ’ মানুষের কাছে দলটি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
শনিবারের নির্বাচনের ফল জনমত জরিপের সঙ্গে মিলে গেলে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ করবে অপারচুনিটি পার্টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ক্ষমতাসীন ডানপন্থী জোট এবং বিরোধী বামপন্থী জোট— উভয়েরই দলটির সমর্থন প্রয়োজন হবে।
এর অর্থ, কিউলে ওং কোন পক্ষের সঙ্গে সরকার গঠন করবেন; তা বেছে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তার দলও দুপক্ষের যেকোনোটির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
তবে ডানপন্থী ন্যাশনাল পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন এরই মধ্যে নির্বাচনের পর অপারচুনিটি পার্টির সঙ্গে কোনো সমঝোতা না করার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে ক্ষমতা ধরে রাখতে তাকে শেষ পর্যন্ত এই অবস্থান থেকে সরে আসতে হতে পারে। অন্যথায় ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
এ বছর নিজ দলের সংসদীয় দলের আস্থা নিয়ে দুটি ভোটের মুখোমুখি হয়েও নেতৃত্ব ধরে রেখেছেন লাক্সন। তবে তিনি কিংবা তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির ক্রিস হিপকিন্স— যিনি নিজেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী, কেউই সাবেক নেতা জাসিন্ডা আরডার্ন ও জন কির মতো জনসমর্থন অর্জন করতে পারেননি।
প্রধান দুই দলের নেতাদের আপেক্ষিক অজনপ্রিয়তা কয়েক দশকের পুরনো নির্বাচনী প্রবণতা ভেঙে দিয়েছে। আগে প্রধান দুই দলের নেতাদের মধ্যে সরাসরি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরেই নির্বাচনী প্রচার চলত। এবার ছোট দলগুলো বেশি মনোযোগ পাচ্ছে এবং পরবর্তী সরকারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের অবস্থানে পৌঁছেছে।
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই দেশটির মিশ্র-সদস্য আনুপাতিক (এমএমপি) নির্বাচনী ব্যবস্থায় জোট সরকার প্রায় নিয়মিত ঘটনা। তবে ঐতিহ্যগতভাবে ছোট দলগুলো জোটের সহযোগী হিসেবেই থেকেছে। মন্ত্রিসভায় সামান্য কয়েকটি পদ এবং নীতিনির্ধারণে সীমিত কিছু ছাড় পেয়েছে তারা।
কিন্তু এ বছর ছোট দলগুলো যে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তা ‘নজিরবিহীন’ বলে মনে করছেন গ্রিভস। তিনি বললেন, ‘এবারই প্রথম আমরা এমন জোট চুক্তি দেখতে যাচ্ছি, যেখানে ছোট দলগুলো স্পষ্টভাবে বলবে— আমরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোট পেয়েছি। আমাদের সঙ্গে শিশুদের মতো আচরণ করা বন্ধ করতে হবে।’
তবে এতে ভোটারদের জন্য কোন দলকে ভোট দিলে কী পাওয়া যাবে, তা বোঝা ‘খুব কঠিন’ হয়ে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ব্যাখ্যা, নির্বাচনী প্রচারের সময় খুব বেশি গুরুত্ব না পাওয়া ছোট দলগুলোর কিছু বিতর্কিত নীতি শেষ পর্যন্ত জোট গঠনের আলোচনার পর সরকারের কর্মসূচিতে জায়গা করে নিতে পারে।
নিউজিল্যান্ডের এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে ডানপন্থী হিসেবে বিবেচিত ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল পার্টির জোট সরকারকে আরও ডানদিকে ঠেলে দিতে পারে তাদের শক্তিশালী শরিক দলগুলো। নির্বাচনী প্রচারে এসব দল কখনো কখনো সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ ঘিরে বিভাজনমূলক নীতি আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, ডানপন্থী উদারতাবাদী অ্যাক্ট পার্টি দেশটির মেডিকেল স্কুলগুলোয় ইতিবাচক বৈষম্য নীতির অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করেছে। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী দল নিউজিল্যান্ড ফার্স্ট ব্যাপক অভিবাসন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দলটির জনতুষ্টিবাদী নেতা উইনস্টন পিটার্স সমকামিতা পরিবর্তনের কথিত চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নিষেধাজ্ঞা পর্যালোচনার পক্ষেও মত দিয়েছেন।
গ্রিভস বললেন, ‘২০২৩ সালের সরকারকে অনেকেই এরই মধ্যে ডানদিকে বড় ধরনের ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখেন, বিশেষ করে আদিবাসী মাওরিদের অধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে। ফলে এটি মধ্যপন্থী ভোটারদের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।’
অন্যদিকে, বামপন্থী জোট সরকার গঠন করতে পারলে ভোটারদের ওপর নতুন করে নানা ধরনের করের বোঝা চাপবে বলে সতর্ক করেছে ডানপন্থী দলগুলো। লেবার পার্টি মূলধনি মুনাফার ওপর কর আরোপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর বামপন্থী গ্রিন পার্টি ‘অতি ধনীদের’ পাশাপাশি বিদেশে মুনাফা সরিয়ে নেওয়া বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে।
গ্রিভস বলেছেন, ‘বামপন্থী জোট জয়ী হলে তারা যে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চায়, তার অর্থের জোগান কীভাবে দেবে, তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হবে।’
সাম্প্রতিক কয়েক দশকে নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনগুলোর ফল সাধারণত সহজেই অনুমান করা যেত। কিন্তু এবার ভোটাররা কী রায় দেবেন, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞরাও হিমশিম খাচ্ছেন।
গ্রিভস বললেন, ‘কী ঘটতে যাচ্ছে? কোনো ধারণাই নেই।’
লাক্সনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পার্টির জোট সরকার হেরে গেলে, তা হবে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের প্রথম এক মেয়াদের সরকার।
সূত্র: সিএনএন




