নভেম্বরে নির্বাচন, যেভাবে সরকার গড়ে নিউজিল্যান্ড

ছবি: রয়টার্স
নিউজিল্যান্ডে নতুন সরকার নির্বাচনের জন্য ৭ নভেম্বর ভোট দেবেন দেশটির নাগরিকেরা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব ও স্বাস্থ্যসেবা—ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে। এদিন তারা পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচন করবেন।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপে কোনো দল বা প্রার্থীকে স্পষ্টভাবে এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে না। ২০২৩ সালের নির্বাচনে ‘অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়ী হয়েছিল ক্ষমতাসীন মধ্য-ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুকসনের দল।
ভোটের পদ্ধতি কী?
নিউজিল্যান্ডে প্রতি তিন বছর পরপর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশটিতে মিক্সড-মেম্বার প্রোপোরশনাল (এমএমপি) পদ্ধতিতে ভোট হয়।
প্রত্যেক ভোটার দুটি ভোট দেন—একটি নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য, অন্যটি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে।
কোনো নির্বাচনী এলাকায় যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই জয়ী হন এবং পার্লামেন্টের সদস্য হন।
অন্যদিকে, পার্লামেন্টে আসন পেতে রাজনৈতিক দলগুলোকে মোট দলীয় ভোটের অন্তত ৫ শতাংশ পেতে হয়। দলগুলোর মধ্যে আসনও আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়। অর্থাৎ, কোনো দল মোট দলীয় ভোটের ৪০ শতাংশ পেলে দলগুলোর জন্য বরাদ্দ আসনের ৪০ শতাংশ পাবে।
নিউজিল্যান্ডের পার্লামেন্টে সাধারণত ১২০টি আসন থাকে। এর মধ্যে ৭১টি আসন নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিদের জন্য এবং বাকি ৪৯টি আসন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়।
নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে কোনো একটি দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিরল। তাই সরকার গঠনের জন্য দলগুলোকে জোট করতে হয়।
ছোট দলগুলো যাতে ভোটের ফলাফলে উপেক্ষিত না থাকে, সেই উদ্বেগ থেকে ১৯৯৬ সালে এমএমপি পদ্ধতি চালু করে নিউজিল্যান্ড।
কারা প্রার্থী?
বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুকসন। তার মধ্য-ডানপন্থী ন্যাশনাল পার্টি ২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসে। দলটি অ্যাক্ট ও নিউজিল্যান্ড ফার্স্ট পার্টির সঙ্গে জোট করে সরকার পরিচালনা করছে।
অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা, বাজেট উদ্বৃত্ত ফিরিয়ে আনা এবং দেশটির অবসরকালীন সঞ্চয় প্রকল্প কিউইসেভারের পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে লুকসনের দল।
প্রধান বিরোধী দল মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টি। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্রিস হিপকিনস।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আবাসন, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবায় বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে লেবার পার্টি।
ন্যাশনাল পার্টির জোটসঙ্গীদেরও নিজস্ব অগ্রাধিকার রয়েছে। ডেভিড সিমুরের নেতৃত্বাধীন অ্যাক্ট পার্টি আরও কঠোর অভিবাসননীতির পক্ষে। অন্যদিকে, উইনস্টন পিটার্সের নেতৃত্বাধীন নিউজিল্যান্ড ফার্স্ট ভোট দেওয়ার যোগ্যতায় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে। দলটি চায়, নিউজিল্যান্ডে শুধু দেশটির নাগরিকেরাই ভোট দিতে পারবেন।
নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দল গ্রিন পার্টি। ক্লোয়ি সোয়ারব্রিক ও মারামা ডেভিডসনের যৌথ নেতৃত্বাধীন দলটি সম্পদ কর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সরকারি সেবার মতো বিষয় নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে।
মাওরি জনগোষ্ঠীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী তে পাতি মাওরিও পার্লামেন্টের আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সাংবিধানিক সংস্কার দলটির অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে।
প্রধান ইস্যু কী কী?
নিউজিল্যান্ডের ভোটারদের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি বড় উদ্বেগের বিষয়।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর একটি বলে মনে করেন। ৪৪ শতাংশ উত্তরদাতার কাছে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্বাস্থ্যসেবা ও হাসপাতাল। এরপর রয়েছে অর্থনীতি—৩৪ শতাংশ।
বেকারত্ব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। একই জরিপে ২১ শতাংশ উত্তরদাতা এটিকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আবাসন সংকটকে পেছনে ফেলে বেকারত্ব এখন নিউজিল্যান্ডের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
কখন জানা যাবে নির্বাচনের ফল?
৭ নভেম্বর স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় ভোটকেন্দ্রগুলো খুলবে। ভোট গ্রহণ শেষ হবে সন্ধ্যা ৭টায়। ২৬ অক্টোবর থেকে আগাম ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। দেশের বাইরে থাকা নাগরিকদের ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে আরও আগে, ২১ অক্টোবর।
নির্বাচনের দিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে নিউজিল্যান্ডের সরকারি নির্বাচনী ফলাফলবিষয়ক ওয়েবসাইটে ধাপে ধাপে প্রাথমিক ফল প্রকাশ করা হবে। তবে এসব ফল চূড়ান্ত বা আনুষ্ঠানিক ফল হিসেবে গণ্য হবে না।
ভোট গণনা ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ২৭ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করার কথা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
নির্বাচনের রাতেই স্পষ্ট ফল পাওয়া গেলে কোন দলগুলো সরকার গঠনের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে, সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হাড্ডাহাড্ডি হলে এবং কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
তাই পরবর্তী তিন বছর নিউজিল্যান্ডের নেতৃত্বে কারা থাকবেন এবং কোন দলগুলো মিলে সরকার গঠন করবে, তা জানতে নির্বাচনের রাতের পরও অপেক্ষা করতে হতে পারে দেশটির নাগরিকদের।
সূত্র : বিবিসি



