অস্তাচলে ইসরায়েলের বাণিজ্যিক সূর্য, পশ্চিমের তিন দুয়ার বন্ধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এক টুকরো জমির পর আরেক টুকরো জমি। বসতি গড়তে গড়তে অধিকৃত পশ্চিম তীরের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে ইসরায়েল। এতদিন সেই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর মুখে শোনা গেছে নিন্দা, উদ্বেগ আর সতর্কবার্তা। এবার কথার জায়গা নিল শাস্তিমূলক পদক্ষেপ। ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের জন্য নিজেদের বাজারের দরজা বন্ধ করে দিল ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা। একই পদক্ষেপ নেওয়ার পথে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ। হঠাৎ এ ঘোষণাতেই অস্তাচলে যেতে বসেছে ইসরায়েলে মধ্যগগনের বাণিজ্যিক সূর্য।
তিন দেশের বক্তব্যও স্পষ্ট— অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ শুধু ফিলিস্তিনিদের ভূমিই সংকুচিত করছে না, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকেও ক্রমেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাই অধিকৃত ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা বসতিগুলো যেন আর সহজে অর্থনৈতিক সুবিধা না পায়, সেই পথ বন্ধ করতেই এবার কঠোর হচ্ছে তারা।
গতকাল মঙ্গলবার রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বসতি-পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি বসতি সম্প্রসারণে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছে ব্রিটেন। পার্লামেন্টে নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ ঘোষণা করে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন, পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য আমদানি বন্ধ করা হবে। বসতি সম্প্রসারণে জড়িত কোম্পানি ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। পাশাপাশি দখলদারিত্বকে সরাসরি সহায়তা করতে পারে— এমন অস্ত্র বা অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি লাইসেন্সও প্রত্যাখ্যান করবে লন্ডন।
মিলিব্যান্ড বলেছেন, ‘দখলদারিত্বের বেআইনি চরিত্র আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্কেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।’ তার ভাষায়, ব্রিটিশ সরকার এখন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ‘সমগ্র দখলদারিত্বকেই’ বেআইনি বলে বিবেচনা করছে। তিনি বলেছেন, বসতি সম্প্রসারণ, স্থায়ী সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত এবং জমি দখলের নীতিই এ অবস্থান বদলের কারণ।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও কঠোর ভাষায় বললেন, পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় ‘সেটলার সন্ত্রাসীদের’ হাতে ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নির্মূল ঘটছে এবং ইসরায়েলি সরকারের অংশবিশেষ তা ঠেকানোর বদলে অনেক সময় উল্টো উৎসাহ দিচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এই পদক্ষেপ ইসরায়েলি জনগণের বিরুদ্ধে নয়; লক্ষ্য নেতানিয়াহু সরকারের দখল ও বসতি নীতি।
রয়টার্স জানিয়েছে, ফ্রান্স ও কানাডাও একই ধরনের আমদানি নিষেধাজ্ঞায় যুক্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, পোল্যান্ড, পর্তুগাল ও সুইডেন আরও পদক্ষেপে সমর্থন দিচ্ছে। নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেন ও নরওয়ে এরই মধ্যে বসতি-পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বা সেই প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির সময় অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার বসতি স্থাপনকারী ছিলেন; এখন সেই সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার। ২০২৩ সালের পর থেকে ৬৫টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় পুরোপুরি উচ্ছেদ হয়েছে এবং চার হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি ঘরছাড়া হয়েছেন। মিলিব্যান্ড আরও জানিয়েছেন, চলতি বছর প্রতিদিন গড়ে ছয়টি সহিংস বসতি-হামলার তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘ।
এ অবস্থান ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের উপদেষ্টা মতামতের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। আদালত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের উপস্থিতিকে বেআইনি বলেছিল। সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টও পশ্চিম তীরের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সহিংস ও অপরাধমূলক জাতিগত নির্মূলের চেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
নতুন ব্যবস্থায় কৃষিপণ্য ছাড়াও বসতি সম্প্রসারণে জড়িত নির্মাণ, অবকাঠামো, অর্থায়ন ও আবাসন ব্যবসার প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিরাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসতে পারেন। অবৈধ বসতির বিজ্ঞাপনও নিষিদ্ধ করবে ব্রিটেন। এই বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা কার্যকর হতে ৬ থেকে ৯ মাস লাগতে পারে।
এদিকে, লন্ডনের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ ব্রিটেনের বিরুদ্ধে আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও পদক্ষেপটির সমালোচনা করেছেন।
তবে লন্ডনের বক্তব্য, বসতি-বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা পুরো ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ নয়। গ্রিনলাইনের ভেতরের ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্য চলবে।





