ইসরায়েলের সামনে পাঁচ ভবিষ্যৎ
জাতীয় ঐক্যের সরকার নাকি আবার নির্বাচন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভোটের ফল সামনে এলেও ইসরায়েলের ক্ষমতার অঙ্ক এখনো অধরা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শিবির কিংবা বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন শিবির— কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। সে ইঙ্গিতই উঠে আসছে ভোটকেন্দ্রের বুথফেরত জরিপে। এ পরিস্থিতিতে সামনে এসেছে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এমন সরকার গঠনে আগ্রহী বলে একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে ফের নির্বাচনের মুখে পড়তে পারে দেশটি। এরই মধ্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহু নতুন করে যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়াতে পারেন, এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে ইসরায়েলের সামনে এখন পাঁচটি সম্ভাব্য পথ— নেতানিয়াহুর নতুন জোট সরকার, জাতীয় ঐক্যের সরকার, বিরোধীদের সংখ্যালঘু সরকার, বিকল্প অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা ফের নির্বাচন।
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। গত মঙ্গলবারের নির্বাচনের পর গতকাল বুধবার সকালে ৪০ লাখের বেশি ভোট গণনার ভিত্তিতে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট ৫৪টি আসন পেতে পারে। গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য আসন ৪৭টি। অন্যদিকে, আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে। পরে আংশিক গণনার অন্য একটি হিসাবে নেতানিয়াহুর শিবিরের আসন ৫৭, বিরোধীদের ৪৭ এবং আরব দলগুলোর ১৬টি বলে জানানো হয়। অর্থাৎ ভোট গণনার বিভিন্ন পর্যায়ে আসনসংখ্যার হিসাব বদলেছে। কোনো হিসাবই চূড়ান্ত ফল নয়।
দলভিত্তিক প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৭-২৮টি আসন পেতে পারে। তার জোটের শরিক ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, শাস ও ইতামার বেন-গভিরের ওতজমা ইয়েহুদিতের সম্ভাব্য আসন সাতটি করে। বেজালেল স্মোটরিচের রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টি পেতে পারে ছয়টি আসন। বিরোধী শিবিরে আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির সম্ভাব্য আসন ২১, নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের জোট ‘বিয়াখাদ’-এর ১১-১৩টি, ইয়াইর গোলানের ডেমোক্র্যাটসের ৭-১০টি এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনুর সাত থেকে আটটি। আরব দলগুলোর মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট ও মানসুর আব্বাসের রা’আমের সম্মিলিত আসনসংখ্যা বিভিন্ন প্রাথমিক হিসাবে ১৬-১৯টির মধ্যে রয়েছে। এসব সংখ্যা বদলাতে পারে।
পাঁচ সম্ভাবনা, কোন পথে ইসরায়েল?
প্রথম সম্ভাবনা, নেতানিয়াহু বিরোধী শিবিরের কোনো কোনো সংসদ সদস্যকে নিজের দিকে টেনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়ার চেষ্টা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের মধ্যে সমঝোতা হলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠিত হতে পারে। তবে আইজেনকট নেতানিয়াহুর অধীনে সরকারে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাবেও তার আপত্তি রয়েছে। বেনেট ও লিবারম্যানও নেতানিয়াহুর জোটে যোগ দিতে অনিচ্ছুক। ফলে ঐক্যের সরকার গঠনের পথে বড় বাধা রয়েছে।
তৃতীয় সম্ভাবনা, আইজেনকটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার গঠন। এক্ষেত্রে আরব দলগুলোর সমর্থন অথবা আস্থা ভোটে তাদের ভোটদানে বিরত থাকার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু বিরোধী শিবিরের অধিকাংশ নেতা আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে চাইছেন না।
চতুর্থত, নেতানিয়াহুর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে সাময়িকভাবে আইজেনকটের নেতৃত্বে বিকল্প সরকার গঠনের চেষ্টা হতে পারে। আর পঞ্চম সম্ভাবনা, কোনো সমঝোতা না হলে ফের নির্বাচন।
জাতীয় ঐক্যের সরকার চান ট্রাম্প?
এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। ওয়াল্লার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নেতানিয়াহু ও বিরোধী শিবিরকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনে আগ্রহী ট্রাম্প। সেই সরকারের কাঠামোয় নেতানিয়াহু থাকলেও অতি ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোটরিচকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে বলে মার্কিন সূত্রের দাবি। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ট্রাম্পের আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে বাধা সৃষ্টি করছে বলে ওই সূত্রের বক্তব্য। তবে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি।
নতুন যুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না
গত এক সপ্তাহে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে যে, ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহু ইরান বা প্রতিবেশী কোনো দেশের সঙ্গে নতুন সংঘাত শুরু করতে পারেন অথবা চলমান সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন।
‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নেতানিয়াহু ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের ধারণা তুলে ধরেছেন। লিকুদ পার্টির এক কর্মকর্তা সংবাদপত্রটিকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প চান ইসরায়েলে দ্রুত একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সরকার গঠিত হোক। তবে সেই সরকারের রূপরেখা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা সরকার গঠনের আলোচনাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং বিরোধী দলগুলোকে মতপার্থক্য সরিয়ে রেখে একসঙ্গে কাজ করার চাপের মুখে ফেলতে পারে।
সরকার গঠনে কতদিন সময় পাবেন?
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হের্ৎসগ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের দায়িত্ব এমন এক সংসদ সদস্যকে দেবেন, যার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন জোগাড় করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। এই দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় থাকবে। প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারেন। অর্থাৎ, প্রথম দফায় সর্বোচ্চ ৪২ দিন। ওই প্রার্থী ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য এক সংসদ সদস্যকে ২৮ দিনের জন্য সুযোগ দিতে পারেন। দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হলে নির্দিষ্ট শর্তে সংসদের অন্তত ৬১ জন সদস্যের সমর্থন নিয়ে তৃতীয় প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি ১৪ দিন সময় পাবেন। সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের পথ খুলতে পারে। নতুন সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বিদায়ী সরকার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবে।
চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল ৪ নভেম্বরের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার কথা। তার আগে ভোট গণনার অগ্রগতির সঙ্গে আসনসংখ্যার হিসাব বদলাতে পারে। আপাতত ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর। জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠিত হবে, বিরোধীরা বিকল্প সরকার তৈরিতে সফল হবে, নাকি অচলাবস্থা কাটাতে দেশটিকে আবার নির্বাচনে যেতে হবে— সে উত্তর এখনো অধরা।



