ঘুমের ফাঁদে মৃত্যুর ছায়া, ৪০ বছরের রহস্য ভাঙল বিজ্ঞান

মানুষ আটকে যায় বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝখানে
আফ্রিকার উত্তপ্ত প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায় এক অদৃশ্য আতঙ্ক। চোখে দেখা যায় না, শব্দ শোনা যায় না। তবুও সে ধীরে ধীরে মানুষের শরীর দখল করে নেয়। শুরুতে সামান্য ক্লান্তি, তারপর অদ্ভুত ঘুমঘুম ভাব, আচরণে পরিবর্তন… আর একসময় মানুষ হারিয়ে যায় নিজের ভেতরেই। এই ভয়ংকর অসুখটির নাম স্লিপিং সিকনেস, আমরা বলি ঘুমের রোগ।
এই রোগের গল্পটা আসলে এক নিঃশব্দ অনুপ্রবেশের গল্প। শুরু এক কামড়েই। সেতসি মাছির ছোট্ট দংশনে মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ে ট্রাইপানোসোমা ব্রুসেই নামের এক ক্ষুদ্র পরজীবী। এতটাই ছোট যে, চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু তার কৌশল এতটাই নিখুঁত যে, পুরো শরীরকে ধীরে ধীরে অচল করে দিতে পারে।
শুরুতে সে ঘোরাফেরা করে রক্তে। আক্রান্ত মানুষ কিছুটা জ্বর, কিছুটা দুর্বলতা টের পায়—কিন্তু তাতে খুব একটা ভয় লাগে না। তারপর একসময় এই পরজীবী পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে। তখনই শুরু হয় আসল খেলা। দিনের বেলায় অকারণে ঘুম পায়, রাতে চোখে ঘুম আসে না। মানুষ বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝখানে আটকে যায়। কথাবার্তা জড়িয়ে যায়, আচরণ বদলে যায়, মন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত শরীর ডুবে যায় গভীর অচেতনায়। যেখান থেকে ফেরাটা অনেক সময় আর সম্ভব হয় না।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো— এই পরজীবীকে শরীর এত সহজে ধরতে পারে না। আমাদের শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা আছে, যা বাইরের শত্রু চিনে ফেলে। তবুও এই ক্ষুদ্র জীবটি বছরের পর বছর ধরে সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে এসেছে। কারণ, এটি নিজের গায়ে বারবার নতুন এক ধরনের আবরণ তৈরি করে— ভ্যারিয়েন্ট সারফেস গ্লাইকোপ্রোটিন। সহজ করে বললে, এটি যেন এক পলাতক অপরাধী, যে বারবার নিজের মুখোশ বদলে নেয়। ফলে শরীর তাকে চিনতে পারে না, ধরতেও পারে না।
এই কৌশল বিজ্ঞানীদের জানা ছিল বহুদিন। কিন্তু এক গভীর রহস্য তাদের তাড়া করে ফিরছিল। এই পরজীবী কীভাবে এত দ্রুত তার ছদ্মবেশ বদলায়, আবার একই সঙ্গে শরীরের ভেতরে তার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজও চালিয়ে যায়? দুই কাজ একসঙ্গে এত নিখুঁতভাবে করা কীভাবে সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কেটে গেছে চার দশক।
অবশেষে সেই রহস্যের পর্দা সরালেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক-এর গবেষকরা। তারা খুঁজে পেলেন এক অদ্ভুত প্রোটিন— ইএসবিটু। নামটা যত ছোট, কাজটা ততই বিস্ময়কর। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘মলিকিউলার শ্রেডার’ বা অণু-স্তরের কাগজ কাটা যন্ত্র।
আমাদের শরীরে প্রোটিন তৈরির সব নির্দেশ লুকিয়ে থাকে আরএনএতে। এই আরএনএ যেন একেকটা বার্তা, যা কোষকে বলে দেয় কী তৈরি করতে হবে। কিন্তু এই ইএসবিটু সেই বার্তাগুলোর ওপর বসে এক নির্মম কাজ করে, প্রায় সব নির্দেশ কেটে ফেলে দেয়, ধ্বংস করে দেয়, শুধু একটিকে ছাড়া। সেটি হলো সেই ছদ্মবেশ তৈরির নির্দেশ। ফলে পরজীবী তার সব শক্তি ঢেলে দেয় শুধু নিজের আবরণ তৈরিতে। অন্য সব কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই সে হয়ে ওঠে প্রায় অদৃশ্য। শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার চোখের সামনে থেকেও লুকিয়ে থাকে।
গবেষকরা যখন এই ইএসবিটুকে নিষ্ক্রিয় করে দিলেন, তখন দেখা গেল এক নাটকীয় পরিবর্তন। হঠাৎ করেই পরজীবীর ভেতরের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। যেসব প্রোটিন আগে তৈরি হচ্ছিল না, সেগুলো তৈরি হতে শুরু করে। তার ছদ্মবেশ দুর্বল হয়ে যায়। যেন এক মুহূর্তেই মুখোশ খুলে পড়ে যায়, আর শত্রু স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই আবিষ্কার শুধু একটি রোগের রহস্য ভাঙেনি, বরং জীবনের ভেতরের এক সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দিকেও নতুন করে আলো ফেলেছে। বিজ্ঞানীরা এখন ভাবছেন, যদি এই ইএসবিটুকে লক্ষ্য করে ওষুধ তৈরি করা যায়, তাহলে পরজীবীর এই ছদ্মবেশ ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে। তখন শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সহজেই তাকে চিনে ফেলবে, আক্রমণ করবে, আর নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে রোগটিকে।
ঘুমের রোগ তাই আর শুধু একটি অসুখ নয়, এটি এক দীর্ঘদিনের বুদ্ধির লড়াই। একদিকে মানুষের বিজ্ঞান, অন্যদিকে এক ক্ষুদ্র জীবের কৌশল। চার দশক ধরে মানুষ খুঁজেছে, কীভাবে নিজেকে আড়াল করে রাখে এই শত্রু। আজ সেই রহস্যের দরজা একটু খুলেছে। এখনো চিকিৎসা পুরোপুরি আসেনি, কিন্তু অন্ধকারের ভেতর একটি আলোর রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর সেই আলোই হয়তো থামিয়ে দেবে একদিন এই নিঃশব্দ ঘাতককে।
















