দাবানল থেকে বেঁচে আরেক অগ্নিকুণ্ডে মাইকেল জনসন

সংগৃহীত ছবি
গত বছর ভয়াবহ দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল মাইকেল জনসনের বাড়ি। অলিম্পিকে ৪টি সোনা জেতা এই কিংবদন্তি লস অ্যাঞ্জেলেসের উত্তরের পাহাড়গুলোতে দাবানল ছড়িয়ে পড়লে স্ত্রী আরমিনসহ আটকা পড়েন অগ্নিকুণ্ডের মাঝখানে। তখন থেকে ছয়টি আলাদা ভাড়া বাড়িতে দিন কাটিয়েছেন জনসন। ১৮ মাস পরেও নিজেদের ভিটায় ফিরতে পারেননি তিনি।
সেই দাবানলে ৩৭ বর্গমাইল এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে অভিজাত এলাকার প্রায় ৭,০০০ ভবন । চার-চারটি অলিম্পিক সোনা ও আটটি বিশ্ব খেতাবসহ তার অ্যাথলেটিক্স ক্যারিয়ারের স্মারকগুলো অবশ্য অগ্নিকাণ্ড থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়।
৫৮ বছর বয়সে তিনি কম মানসিক ও শারীরিক আঘাত সহ্য করেননি। ২০১৮ সালে স্ট্রোকের কারণে প্রথমে বাঁ দিকের সম্পূর্ণ অনুভূতির ক্ষমতা হারিয়ে ফেললেও সেখান থেকে সুস্থ হয়ে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন জনসন। তবে ‘গ্র্যান্ড স্ল্যাম ট্র্যাক’ নামে অ্যাথলেটিক্সকে নতুন রূপ দেওয়ার স্বপ্নের টুর্নামেন্টটা দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠে জনসনের জীবনে। এতটাই যে, এটা এক পর্যায়ে তার সুনাম ও মর্যাদা পুড়িয়ে ফেলার উপক্রম করেছিল।
জনসনের হাত ধরে গড়ে ওঠা 'গ্র্যান্ড স্ল্যাম ট্র্যাক'-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বসেরা দ্রুততম দৌড়বিদদের এমন এক খ্যাতি ও আর্থিক নিরাপত্তা এনে দেওয়া, যা এতদিন তাদের কাছে অধরা ছিল। এ নিয়ে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জনসন বললেন,‘আমি একটা ছয় বছরের বাচ্চাকে টিভির সামনে বসিয়ে দিতে পারি, আমাকে কোনো নিয়ম বোঝাতে হবে না। যে সবার আগে ফিনিশিং লাইন পার করবে, সেই জিতবে। কিন্তু এর মধ্যেও নানা পর্যায় আছে, যা মানুষ বুঝতে চায়। একজন অ্যাথলেট কীভাবে ৪৩ সেকেন্ডে ৪০০ মিটার পার করে? এর জন্য কী ধরনের প্রস্তুতির প্রয়োজন? তখন আপনি বুঝতে শুরু করবেন যে এটি কেবল গতির বিষয় নয়, যা দেখায় ততটা সহজ নয়। এটি অত্যন্ত জটিল-আর এই জটিলতার মধ্যেই আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।’
অ্যাথলেটিক্সের এই মাহাত্ম্য ফুটিয়ে তোলার জন্য মাইকেল জনসনের চেয়ে যোগ্য আর কেউ হতে পারেন না। ১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিকে তার ২০০ মিটারের পারফরম্যান্স আজও খেলার জগতের অন্যতম সেরা অবিশ্বাস্য কীর্তি। জর্জিয়ার সেই রাতে জনসনের সোনালি জুতো, ছোট ছোট দ্রুত পদক্ষেপ আর একদম সোজা হয়ে দৌড়ানোর চেনা ভঙ্গি দেখে ধারাভাষ্যকার ডেভিড কোলম্যান চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন, ‘এ আর যাই হোক মানুষ হতে পারে না!’
১৯৯৯ সালে সেভিলে যখন তিনি ৪৩.১৮ সেকেন্ডে ৪০০ মিটার দৌড়ের বিশ্বরেকর্ড গড়েন, তখন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১.১১ সেকেন্ড পেছনে ছিলেন! সবচেয়ে বড় কথা , অ্যাথলেটিক্সে ডোপিং কেলেঙ্কারি থেকে নিজেকে সবসময় দূরত্বে রেখেছেন এবং অনৈতিক ড্রাগ ব্যবহারের বিরুদ্ধে চিরকাল উচ্চকণ্ঠ থেকেছেন জনসন।
তাই ২০২৪ সালে যখন তিনি 'গ্র্যান্ড স্ল্যাম ট্র্যাক'-শুরু করেন, তখন সেটা ক্রীড়াবিশ্বে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। তিনি অলিম্পিকের বাইরেও অ্যাথলেটিক্সকে নতুন আলোয় আলোকিত করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
অবশেষে গত বছর এপ্রিলে জ্যামাইকার কিংস্টনে তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটে। লক্ষ্য ছিল গলফ ও টেনিসের গ্র্যান্ড স্ল্যামের মতো বছরে চারবার বিশ্বের সেরা ১০০ জন অ্যাথলেটকে একসঙ্গে এনে বিশ্বমঞ্চে নামানো। যার প্রথম মৌসুমেই পুরস্কার মূল্য রাখা হয়েছিল ৯.৭ মিলিয়ন পাউন্ড।
ব্রিটেনের মিডল-ডিসটেন্স অ্যাথলেট জশ কের এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গতি তারকা গ্যাবি থমাস ও সিডনি ম্যাকলাফলিন-লেভরোনেরা অংশ নেন তাতে। ওপর ওপর সবকিছু স্বাভাবিক ও মসৃণ মনে হলেও, আড়ালে আর্থিক ভিত ছিল ভীষণ নড়বড়ে। যখন জ্যামাইকার ইভেন্টে স্টেডিয়ামের গ্যালারি তিন ভাগের এক ভাগও ভরেনি, তখন চেলসি ফুটবল ক্লাবের সহ-মালিক টড বোয়েলির বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান 'এলড্রিজ' হঠাৎ পিছিয়ে যায় এবং প্রতিশ্রুতি দেওয়া ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। চোখের পলকে শুরু হয়ে যায় বিশৃঙ্খলা।
গ্র্যান্ড স্ল্যাম ট্র্যাক ২০০টি দেশে বিনামূল্যে সম্প্রচারের চুক্তি নিশ্চিত করেছিল, তবে জনসনের ব্যক্তিগত সম্পদ দিয়ে এই বিশাল প্রজেক্ট টিকিয়ে রাখা অসম্ভব ছিল। বিনিয়োগকারীরা অর্থ তুলে নেওয়ায় তার হৃদয়ের কাছের এই প্রজেক্টটি পুরো বছর টিকে থাকাই দায় হয়ে দাঁড়ায়। মিয়ামি ও ফিলাডেলফিয়াতে মোটামুটি সফল ইভেন্টের পর, মাত্র দুই সপ্তাহের নোটিশে লস অ্যাঞ্জেলেসের মূল ফাইনাল প্রতিযোগিতাটি বাতিল করতে হয়।
এ নিয়ে জনসন বললেন,‘আমরা এক মারাত্মক মূলধন সংকটের মুখে পড়েছিলাম। যে বিশাল পরিকাঠামো ও বাজেট আমরা তৈরি করেছিলাম, তার তুলনায় অর্থের জোগান অনেক কমে গিয়েছিল। এটি সামলানো আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন ছিল।’
বিশ্বমানের টুর্নামেন্টে জনসন যে ১২টি পদক জিতেছেন, তার সবকটিই সোনা। রৌপ্য বা ব্রোঞ্জ পদকের সঙ্গে তার কোনো পরিচিতিই ছিল না। তাই জনসনের আফসোস,‘মানুষ আমাকে জয়ী হিসেবে চেনে। এমন এক ভাবমূর্তি তৈরি হয়ে গেছে যে সবাই ভাবে, ওহ, মাইকেল তো সবসময় জিতবেই। এবার যে করেই হোক টাকা জোগাড় করার দায়িত্বটা কেবল আমার একারই ছিল। তারা পেশাদার অ্যাথলেট হিসেবে সম্মান চেয়েছিল, আর আমি সবসময় মনে করেছি তা তাদের প্রাপ্য। কিন্তু তাদের জন্য এত কিছু করার পরও, আমি এমন এক পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম যেখানে বুঝে উঠতে পারছিলাম না কীভাবে তাদের বকেয়া মেটাব। এটা সমাধান করার দায়িত্ব কেবল আমার একারই ছিল। আমাকে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি।’
অবশেষে, জনসন অ্যাথলেটদের দেনা মেটাতে ১১ মিলিয়ন ডলার জোগাড় করেন এবং জিএসটি-কে স্বেচ্ছায় দেউলিয়া ঘোষণা করেন। সেই অর্থ একটি বিশেষ ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টে রাখা হয় আর গত মে মাসে একজন ফেডারেল বিচারক তার পরিকল্পনা অনুমোদন করলে, সেই টাকা অ্যাথলেট ও পাওনাদারদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়।
পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি কোনো সাক্ষাৎকার দেননি। অবশেষে টেলিগ্রাফকে জসন বললেন,‘আমি জানতাম, মিডিয়াতে যা-ই ছাপা হোক না কেন, আমি মুখে কী বলছি তা দিয়ে কিছুই বদলাবে না। মানুষ আমার কাজটাই দেখবে, আর গত এক বছর ধরে আমি সেটাই করার চেষ্টা করেছি। আমি অ্যাথলেটদের টাকা মিটিয়েছি, পরিস্থিতিকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। এখন আমি মুখ খুলতে পারি।’
সব মিলিয়ে, জনসন ৮.২ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অর্থ বিতরণ করেছেন—যা কোনো একক ট্র্যাকিং ইভেন্টে অ্যাথলেটদের দেওয়া ইতিহাসের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক। একজন নীতিবান মানুষের জন্য এটি ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। কিন্তু তার নীতি ও লীগ শুরু করার উদ্দেশ্য নিয়ে আক্রমণ থামানোর জন্য এই পদক্ষেপটুকু খুব দেরিতে এসেছিল। অ্যাথলেটদের তরফ থেকেও অসন্তোষের সুর উঠতে শুরু করেছিল,‘দয়া করে আমার টাকা মিটিয়ে দিন।’
টিকটকে পোস্ট করা গ্র্যান্ড স্ল্যাম ট্র্যাকের এক ভিডিওর নিচে কমেন্ট করে লেখেন অলিম্পিক ২০০ মিটার চ্যাম্পিয়ন গ্যাবি থমাস। হার্ডলার এরিক এডওয়ার্ডস জুনিয়র, যিনি তুলনামূলক কম পরিচিত, গত জানুয়ারিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে তার ১৪,০০০ পাউন্ড বকেয়া রয়েছে এবং সংসার চালাতে তাঁকে 'অ্যামাজন'-এর ডেলিভারি ড্রাইভারের পার্ট-টাইম কাজ নিতে হয়েছে।
জনসনের কাছে তার সুনামের ক্ষতিটাই সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ ছিল। একসময় ট্র্যাকে রাজত্ব করা এই তারকা নিজেকে সততার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন—২০০০ সালে সিডনি অলিম্পিকে পাওয়া রিলে সোনা তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, যখন তার সতীর্থ অ্যান্টোনিও পেটিগ্রু স্বীকার করেন যে তিনি সেই সময় ডোপিং করেছিলেন। তাই গ্র্যান্ড স্ল্যাম ট্র্যাকের এই বিশৃঙ্খলার মাঝে তার সদিচ্ছা ও চরিত্র নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন তা তার কাছে পীড়াদায়ক ছিল। নিচু গলায় জনসন বললেন,‘এটাই ছিল পুরো ঘটনার সবচেয়ে কঠিন অংশ। আমার উদ্দেশ্য, সততা আর চরিত্র নিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলছে-এটা মেনে নেওয়া কঠিন ছিল।’
জনসন চারদিক থেকে আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছিলেন, কিন্তু প্রকাশ্যে উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। ডায়মন্ড লীগের প্রতিষ্ঠাতা প্যাট্রিক ম্যাগিয়ার তার প্রতিযোগিতামূলক এই টুর্নামেন্টকে ‘গ্র্যান্ড ফ্লপ ট্র্যাক’ বলে উপহাস করেন। অ্যাথলেটদের এজেন্টরা বিবৃতি জারি করে ‘ন্যূনতম আর্থিক দায়িত্বশীলতার’ দাবি জানায়। এমনকি ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিক্সের সভাপতি লর্ড কো-ও অ্যাথলেটদের বকেয়া পরিশোধের বিলম্ব নিয়ে বলেন,‘সবকিছু ঠিক আছে বলে অভিনয় করার কোনো মানে হয় না। এটা কোনো ভালো পরিস্থিতি নয়।’
এই চরম মানসিক চাপ সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল তাঁর স্বাস্থ্যে। ২০০১ সালে অ্যাথলেটিক্সকে বিদায় জানানোর পর থেকে প্রতি বছরই নিখুঁত হেলথ চেক-আপ করানো ছিল তার অভ্যাস। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতায় তিনি সবসময়ই দারুণ নম্বর পেতেন। সেই তিনি কঠিন সময়গুলো স্মরণ করে বললেন,‘ আমি এত মানসিক চাপের মধ্যে কখনো পড়িনি। আমার এমন অনেক রাত কেটেছে যখন ঘুম আসেনি, আমি জেগে জেগে ভেবেছি, সব দায় আমার। মিডিয়াতে এই খবর ছড়াচ্ছে-অ্যাথলেটরা কি সত্যিই আমাকে ভুল বুঝছে? এই চিন্তাগুলো আমার এবং আমার পরিবারের ওপর বিশাল বোঝা হয়ে চেপে বসেছিল। আমি নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করতাম,তুমি কি বোকা? কেন এসব করতে গেলে? তোমার কি এসবের কোনো দরকার ছিল?'
১৯৯২ সালে বার্সেলোনা অলিম্পিকে ২০০ মিটারে সোনা জয়ের দৌড়ে জনসনই ছিলেন ফেভারিট; কিন্তু সালামানকার একটি রেস্তোরাঁয় ফুড পয়জনিংয়ের শিকার হয়ে সেমিফাইনালের আগেই প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েন। ভেঙে না পড়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, চার বছর পর আটলান্টায় তিনিই হবেন বিশ্বসেরা তারকা-জেসি ওয়েন্স এবং কার্ল লুইসের মতো অ্যাথলেটিক্সের অমর কিংবদন্তিদের তালিকায় নিজের নাম লেখাবেন।
কথা রেখে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন তিনি, একই অলিম্পিকে ২০০ মিটার ও ৪০০ মিটার- দুই ইভেন্টেই সোনা জয়ের অনন্য কীর্তি গড়েন তিনি। সেই জনসন দাবানল থেকে বাঁচার পর উদ্ধার পেয়েছেন আর্থিক কেলেঙ্কারির আরেক দাবানল থেকে।






