উদ্বোধনী ম্যাচে এত লাল কার্ড কখনো দেখেনি বিশ্বকাপ

দক্ষিণ আফ্রিকার থেম্বা জোয়ানেকে লাল কার্ড দেখাচ্ছেন রেফারি।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই জয়-পরাজয় ছাপিয়ে আলোচনায় লাল কার্ড। গতকাল বৃহস্পতিবার উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো যখন দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে উৎসব করছিল, মাঠের ভেতরের আরেকটি পরিসংখ্যান তখন কপালে ভাঁজ ফেলেছে ফুটবলারদের। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে রেফারিকে মোট ৩ বার লাল কার্ড দেখাতে হয়েছে, যা বিশ্বকাপে উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইয়াইয়া সিথোলে এবং থেম্বা জোয়ানে মাঠ ছাড়ার পর ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে লাল কার্ড দেখেন মেক্সিকোর ডিফেন্ডার সিজার মন্তেস। বিশ্বকাপের মাত্র একটি ম্যাচেই যদি ৩টি লাল কার্ড দেখতে হয়, তবে ১০৪ ম্যাচের এই বিশাল টুর্নামেন্টে রেফারিরা কতটা কঠোর হতে যাচ্ছেন—তা নিয়ে ইতিমধ্যেই ফুটবল মহলে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। গত দুটি বিশ্বকাপে (রাশিয়া ও কাতার) যেখানে পুরো টুর্নামেন্ট মিলিয়ে মাত্র ৪টি করে লাল কার্ড দেখেছিলেন দর্শকেরা, সেখানে ২০২৬ আসরের প্রথম ম্যাচেই সংখ্যাটা প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। বিশ্বকাপের কোনো একটি ম্যাচে ৩টি লাল কার্ড দেখার ঘটনা গত ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথম। এর আগে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে এক ম্যাচে ৩ জন খেলোয়াড় বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছিল।
২০১৭ সালে বিখ্যাত রেফারি পিয়েরলুইজি কলিনা ফিফার রেফারিং কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ফুটবল মাঠে লাল কার্ডের সংখ্যা অনেকটাই কমে আসে। গোল করার নিশ্চিত সুযোগ নস্যাৎ করার ক্ষেত্রে লাল কার্ডের আইন অনেকটাই শিথিল করা হয়েছিল। কিন্তু এবারের আসরের শুরুতেই কেন এই কড়াকড়ি? টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এক ব্রিফিংয়ে ইতালিয়ান কিংবদন্তি কলিনা মূলত সময় অপচয় এবং ফুটবলারদের মাঠে বাজে আচরণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। সেখানে লাল কার্ডের ছড়াছড়ি নিয়ে কোনো বাড়তি নির্দেশনা ছিল না। তাহলে কি উদ্বোধনী ম্যাচের রেফারি উইলটন সাম্পাইও একটু বেশিই কঠোর ছিলেন? ম্যাচের প্রথম লাল কার্ডটি নিয়ে অবশ্য কোনো বিতর্ক নেই। মেক্সিকোর ব্রায়ান গুতিয়েরেস যখন একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে ডি-বক্সের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন, তখন তাকে পেছন থেকে ফাউল করে বসেন দক্ষিণ আফ্রিকার সিথোলে। নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করায় রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান।
বিতর্কের ঝড় উঠেছে দ্বিতীয় লাল কার্ডটি নিয়ে। মেক্সিকোর রবার্তো আলভারাডোর সাথে বল দখলের লড়াইয়ের পর ভিএআরের সহায়তায় দক্ষিণ আফ্রিকার থেম্বা জোয়ানেকে ‘সহিংস আচরণের’ দায়ে লাল কার্ড দেওয়া হয়। ভিএআর রিপ্লেতে দেখা যায়, জোয়ানে হাত দিয়ে আলভারাডোর মাথায় আঘাত করেছিলেন। অনেক ফুটবল পণ্ডিতের মতেই, এটি অত্যন্ত কঠোর একটি সিদ্ধান্ত ছিল এবং ভিএআর-এর মূল ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। কলিনা সম্প্রতি রেফারিদের নির্দেশ দিয়েছেন মাঠে তর্কাতর্কির সময় হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা, কিংবা রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো বিষয়গুলোতে কঠোর হতে। জোয়ানের শাস্তি কি তবে ফুটবল মাঠ থেকে খেলোয়াড়দের এই ‘ডার্ক আর্টস’ বা নেতিবাচক আচরণ দূর করারই অংশ?
ম্যাচের যোগ করা সময়ে মেক্সিকোর মন্তেস যখন দক্ষিণ আফ্রিকার মুদাওকে ফাউল করেন, তখনও মেক্সিকান ডিফেন্ডারকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। মুদাও একটু কোণাকুণি পজিশনে থাকায় প্রথমে হলুদ কার্ড মনে হলেও, রিপ্লেতে দেখা যায় সেখানে মন্তেস ছাড়া মেক্সিকোর আর কোনো কাভারিং ডিফেন্ডার ছিল না। ফলে রেফারির সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক বলেই গণ্য হচ্ছে।
উদ্বোধনী ম্যাচের এই উত্তেজনা দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এবারের বিশ্বকাপে হয়তো কার্ডের বন্যা বয়ে যাবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ১০৪ ম্যাচের এই দীর্ঘ টুর্নামেন্টে একটি ম্যাচকে স্রেফ একটি ব্যতিক্রমী বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখা উচিত। মাঠের ভেতরের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রেফারিরা নিয়মের মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।







