বিশ্বকাপ
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে মেক্সিকোর জয়ের নায়ক রাউল

গোলের পর রাউলের উল্লাস।
ছয় বছর আগের এক অভিশপ্ত রাত। ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারের সঙ্গে প্রচণ্ড এক সংঘর্ষে মাথা ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিল তার। মাথার খুলি ফ্র্যাকচার হয়ে মাঠেই অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, সে যাত্রায় বেঁচে ফেরাই ছিল অলৌকিক। ফুটবল খেলা তো দূরের কথা, জীবন নিয়েই ছিল সংশয়।
সেই রাউল হিমেনেস বিশ্বমঞ্চে অনন্য এক রূপকথার জন্ম দিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়েছে স্বাগতিকরা। আর দলের হয়ে ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি এসেছে ৩৫ বছর বয়সী এই মেক্সিকান স্ট্রাইকারের মাথা থেকেই।
ম্যাচের ৬৭ মিনিটে রবার্তো আলভারাডোর ডান প্রান্তের ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক হেডে বল জালে জড়ান হিমেনেস। গোলের পর গ্যালারির ৮০ হাজার দর্শকের উল্লাস আর সতীর্থদের আলিঙ্গনে যখন তিনি আবদ্ধ, তখন নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েন হিমেনেস। দুই হাত দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করেন তিনি, যা ছিল গত মার্চে প্রয়াত তার বাবার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। এর আগে ম্যাচের ৯ মিনিটে হুলিয়ান কিনোনেস গোল করে মেক্সিকোকে এগিয়ে নিয়েছিলেন।
এর আগে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপে মোট ৬টি ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন হিমেনেস। তবে ক্যারিয়ারে এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে মূল একাদশে সুযোগ পান তিনি। আর প্রথম ম্যাচেই বাজিমাত! এই গোলের মাধ্যমে মেক্সিকোর জার্সিতে ১২৫ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা দাঁড়াল ৪৬টিতে। দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় জাভিয়ের হার্নান্দেজের (৫২ গোল) ঠিক পেছনেই যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এলেন তিনি।
চলতি সপ্তাহেই ফুলহাম ছেড়ে নিজের পুরোনো ইংলিশ ক্লাব উলভারহ্যাম্পটন ফেরার চুক্তি সম্পন্ন করেছেন হিমেনেস। তার এমন আবেগময় প্রত্যাবর্তন ছুঁয়ে গেছে ফুটবল পণ্ডিতদেরও। সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল বলেন, '৮০ হাজার স্বদেশের দর্শকের সামনে বিশ্বকাপের গোল—নিশ্চিতভাবেই এটি ওর ফুটবল জীবনের সেরা মুহূর্ত।'
২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনালের বিপক্ষে খেলার সময় ডিফেন্ডার ডেভিড লুইসের সাথে এক ভয়াবহ বিমান সংঘর্ষে জ্ঞান হারান তৎকালীন উলভস তারকা হিমেনেস। মাঠেই তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসকদের কড়া নজরদারিতে কোনো অনুশীলনের অনুমতি ছিল না। আট মাস পর বিশেষ সুরক্ষামূলক হেডব্যান্ড মাথায় পরে মাঠে ফেরেন তিনি। গতকালও মাঠে নামার সময় মাথায় সেই বিশেষ ব্যান্ডটি ব্যবহার করতে হয় তাকে।
ম্যাচ শেষে উলভসের সাবেক সহকারী কোচ এডু রুবিও বিবিসি স্পোর্টসকে বলেন, 'মাথার ওই গুরুতর চোটের পর ও শুধু মাঠেই ফেরেনি, ওর গোল করার ক্ষুধা যে একটুও কমেনি, তা আজ প্রমাণিত। হিমেনেস একজন সত্যিকারের যোদ্ধা। ও অনেক বড় মাপের খেলোয়াড় হলেও মানুষ হিসেবে অত্যন্ত বিনয়ী। ওর এই সাফল্য ওর পুরো পরিবারের ত্যাগ ও লড়াইয়ের ফসল।'




