ভাষা আর ইতিহাসও মিলিয়েছে ফাইনালের দুই দলকে

সংগৃহীত ছবি
আর্জেন্টিনার বিখ্যাত সাহিত্যিক, বিশ্বে স্প্যানিশ ভাষার প্রভাবশালী লেখক হোর্হে লুই বোর্হেস তার একটি লেখায় আর্জেন্টিনার নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতে লিখেছিলেন, ‘একজন আর্জেন্টাইন হচ্ছে আসলে একজন ইতালিয়ান, যে কথা বলে স্প্যানিশ ভাষায়, ভাবে ফরাসিদের মতো আর মনে মনে নিজেকে ভাবে একজন ইংরেজ।’ কথাটির মানে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে অতীতে। দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন আর্জেন্টিনা রাষ্ট্রের জন্ম, গৃহযুদ্ধ, ইউরোপ থেকে অভিবাসীর স্রোত— সবকিছু মিলিয়ে আর্জেন্টিনার জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতিতেই ইউরোপের ছোঁয়া।
প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালের ৯৬ বছর পর ঘটতে যাচ্ছে মজার এক ঘটনা। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলতে নামা দুই দলের খেলোয়াড়দেরই মাতৃভাষা স্প্যানিশ। ১৯৩০ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে মুখোমুখি হয়েছিল; এ দুই দেশের মানুষও কথা বলে স্প্যানিশ ভাষায়। এবার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও স্পেন।
ছবিঃ জাহাজে করে বুয়েনস এইরেসে এসে নামছেন ইউরোপিয়ান অভিবাসীরা
একটা সময় আর্জেন্টিনা ছিল স্পেনের উপনিবেশ। যদিও আর্জেন্টিনায় ফুটবল নিয়ে গেছে ব্রিটিশরা। আবার আর্জেন্টিনা নামটা স্প্যানিশদের দেওয়া! উপনিবেশ আমলে আর্জেন্টিনার নাম ছিল ‘ভাইস রয়্যালিটি অব রিও দে লা প্লাতা’— অর্থাৎ ভাইসরয়ের শাসনের অধীনে নদীর মোহনার অঞ্চল। আর্জেন্টিনা শব্দটা এসেছে রুপার লাতিন আর্জেন্টিয়াম থেকে। স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা রুপার খোঁজে লা প্লাটা নদীর উৎসে এক পৌরাণিক রুপার পাহাড়ের সন্ধানে বারবার ছুটে গিয়েছেন, সেই থেকে ‘লা আর্জেন্টিনা’। এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধের রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে আজকের আর্জেন্টিনা।
স্প্যানিশরা আর্জেন্টিনা শাসন করেছে প্রায় ৩০০ বছর। ১৫০০ শতাব্দীর শুরুর দিকে স্প্যানিশ অভিযাত্রী হুয়ান দিয়াজ দে সলিস লা প্লাটা নদীর অববাহিকা অঞ্চলে প্রথম অভিযানে আসেন আর বুয়েনস এইরেসে ইউরোপিয়ানদের বসতি স্থাপন করতে চেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিরোধের মুখে পড়েন। এরপর ১৫৩৮ সালের দিকে স্প্যানিশরা বুয়েনস এইরেসে বসতি স্থাপন করতে সমর্থ হন আর ১৭৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাইস রয়্যালিটি অব রিও দে লা প্লাতা গঠনের মাধ্যমে স্প্যানিশ রাজতন্ত্রের শাসন প্রতিষ্ঠা হয় বর্তমান আর্জেন্টিনাসহ পেরু ও বলিভিয়ার কিছু অংশে। উপনিবেশ আমলে ১৬০০ ও ১৮০০ শতকে স্পেন থেকে অনেকেই অভিবাসন করেছেন আর্জেন্টিনায়। তবে ইউরোপ থেকে সবচেয়ে বেশি অভিবাসীর স্রোত আর্জেন্টিনায় আসে ১৯ ও ২০ শতকে সরকারের উৎসাহে। ১৮৬০ থেকে ১৯৬০— এই ১০০ বছরে ৬০ লাখের বেশি ইউরোপিয়ান চলে আসেন আর্জেন্টিনায়। দুটি বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত, শিল্পবিপ্লবের ফলে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, মজুরির নিম্নহারসহ অনেক কারণেই ইতালিতে কৃষকরা ধুঁকছিলেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সরকারের উদারনীতি, উচ্চ মজুরি, চাষাবাদের জন্য বিপুল অব্যবহৃত জমি আর আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও সংবিধানের অন্যতম প্রবক্তা হুয়ান বাতিস্তা আলবার্দির তত্ত্ব, ‘শাসন করা মানেই জনবসতি স্থাপন করা’— এই নীতি আকৃষ্ট করে ইউরোপের বিশাল জনগোষ্ঠীকে। সেই সময়টায় বাষ্প ইঞ্জিনের আবিষ্কার হয়ে গেছে, জাহাজ ভ্রমণও সুলভ। তাই ইউরোপ থেকে দলে দলে অভিবাসী এসে বসতি গড়েন আর্জেন্টিনায়। কৃষি উৎপাদন বাড়ে, শিল্পায়ন বাড়ে, অভিবাসীদের সন্তানের জন্মের মাধ্যমে বাড়ে জনসংখ্যা আর সৃষ্টি হয় এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির।
ছবিঃ আর্জেন্টিনায় অভিবাসন করা একটি স্প্যানিশ পরিবার
আর্জেন্টিনার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও দার্শনিক ডমিঙ্গো ফস্তিনো সারমিয়েন্তো তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ফাকুন্দো’তে লিখেছেন, দেশ হিসেবে আর্জেন্টিনার সামনে দুটি বিকল্প ছিল। সভ্যতার দিকে যাওয়া নাকি বর্বরতার দিকে যাওয়া। তার কাছে স্থানীয়, প্রাচীন ও গ্রামীণ সংস্কৃতি ছিল বর্বরতার প্রতীক আর ইউরোপ ছিল সভ্যতার প্রতীক। তার কাছে প্রাচীন সংস্কৃতি আঁকড়ে থাকাকে মনে হয়েছে পেছনের দিকে যাওয়া। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইউরোপের অভিবাসন আর্জেন্টিনার উন্নয়ন করবে। এভাবেই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহেই আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে ইউরোপের বাইরে একখণ্ড ইউরোপ। আজও আর্জেন্টিনার জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ ইউরোপিয়ান বংশোদ্ভূত, ১১ শতাংশ হচ্ছে মেস্তিজো বা মিশ্র, অর্থাৎ স্থানীয় আদিবাসী ও ইউরোপিয়ান রক্তের মিশেল, ২.২০ শতাংশ হচ্ছে আরব ও এশিয়ান এবং মাত্র ১ শতাংশ আর্জেন্টিনার প্রকৃত স্থানীয় বাসিন্দা অর্থাৎ আদিবাসী।
ছবিঃ বুয়েনস এইরেস রাগবি অ্যান্ড ক্রিকেট ক্লাবের এই মাঠের পাশেই একচিলতে জমিতে শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনায় ফুটবল চর্চা।
স্প্যানিশরা এসেছিল উপনিবেশ গড়তে, ইতালিয়ানরা এসেছে কাজের সন্ধানে আর ব্রিটিশরা এসেছিল ব্যবসা করতে। ইউরোপ থেকে অভিবাসীদের যে বিপুল স্রোত আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে এসে আছড়ে পড়ে, তাতে ইংরেজ ছিল সামান্যই। ভারতবর্ষ, আফ্রিকাসহ নানান জায়গায় তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতাকা উড়ছে। দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের আগমন রেললাইন বানাতে আর ধর্ম প্রচারে। ব্রিটিশ পারিবারিক আইনে ছোট ছেলের ভাগে কিছু জোটে না সামান্য মাসোহারা ছাড়া। তাই ভাগ্যান্বেষণে এমন কিছু ইংরেজও চলে এসেছিলেন আর্জেন্টিনায়। অথচ ব্রিটিশদের ছোট্ট সমাজটাই বদলে দিল আর্জেন্টিনাকে। তারাই বানিয়েছিল ক্লাব, স্কুল আর গির্জা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ফুটবলের আগে ক্রিকেট শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনায়! বুয়েনস এইরেসের ক্রিকেট ক্লাবের মাঠের পাশে একখণ্ড জমিতে বুয়েনস এইরেস ফুটবল ক্লাবের গোড়াপত্তন করেছিলেন দুই ইংরেজ অভিবাসী ভাই টমাস ও জেমস হগ। তারিখটা ১৮৬৭ সালের ৯ মে। আর সেই ইংল্যান্ডকেই সেমিফাইনালে হারিয়ে আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেল টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের দোরগোড়ায়। স্প্যানিশ আর ইতালিয়ানরা আর্জেন্টিনাকে করেছে ‘সভ্য’, ইংল্যান্ড শিখিয়েছে ফুটবল। সেই স্পেন ফাইনালের প্রতিপক্ষ, যারা বিশ্বকাপ জিতেছে একবার, ইংল্যান্ডও বিশ্বকাপ জিতেছে একবার, ইতালি ১২ বছর ধরে বিশ্বকাপেই সুযোগ পাচ্ছে না আর আর্জেন্টিনার সামনে চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের হাতছানি। গুরুমারা বিদ্যা তো একেই বলে!







