ক্ষুব্ধ বেলজিয়াম
লাল কার্ডের সিদ্ধান্তও বদলে দিচ্ছেন ট্রাম্প?

বিশ্বকাপের মাঝপথে হুট করেই যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বেলোগানের ওপর থাকা এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। এভাবে টুর্নামেন্টের মাঝে সিদ্ধান্ত বদলে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বমঞ্চের ইতিহাসে নজিরবিহীন। বিতর্কিত এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন (আরবিএফএ)। লাল কার্ড প্রত্যাহারে সোমবার সিয়াটলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠে নামতে আর কোনো বাধা নেই বেলোগানের।
বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, ফুটবলের সততা ও ফেয়ার প্লে-র নীতি বজায় রাখতে তারা এখন আইনিসহ সব ধরনের সম্ভাব্য পথ খতিয়ে দেখছে। এদিকে ফিফার এমন কাণ্ডে ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বেলজিয়ামের ফরাসি কোচ রুডি গার্সিয়া, ‘আমি তো জানতাম না যে ফিফা বিশ্বকাপে এখন ৫ই জুলাইয়ের বদলে ১ এপ্রিল (এপ্রিল ফুল) পালন করা হয়! আমরা এখানে শুধু বেলজিয়াম দল বা আমাদের ফেডারেশনকে ডিফেন্ড করতে আসিনি, আমরা আজ ফুটবল খেলাটার মর্যাদা রক্ষা করতে এসেছি।’
শেষ বত্রিশের ম্যাচে বসনিয়ার এক ডিফেন্ডারের পায়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে আঘাত দেওয়ায় ভিডিও ভিএআর পর্যালোচনার পর সরাসরি লাল কার্ড দেখেছিলেন ২৫ বছর বয়সী বেলোগান। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে একই ধরনের ফাউল করেও লিওনেল মেসি কিন্তু কোনো কার্ড দেখেননি। তাই এই কার্ড নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি লাল কার্ড দেখলে পরবর্তী ম্যাচে এক লাইনের নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কার্যকর হয় এবং এর বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো সুযোগ থাকে না। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে রবিবার ফিফা তাদের ‘ডিসিপ্লিনারি কোড’-এর ২৭ নম্বর ধারা অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে জানায়, বেলোগানের এই নিষেধাজ্ঞা আগামী এক বছরের জন্য স্থগিত করা হলো। আগামী এক বছরের মধ্যে তিনি যদি একই ধরনের কোনো অপরাধ না করেন, তবে তাকে আর এই ম্যাচের শাস্তি ভোগ করতে হবে না। ফিফার এই আকস্মিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিছু আন্তর্জাতিক মিডিয়া এই ঘটনার পেছনে ট্রাম্পের হাত আছে বলেও দাবি করছে।
বিবিসি স্পোর্টস বলছে, ফিফার এই ‘ইউ-টার্ন’ বা সিদ্ধান্ত বদলকে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বড় রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে তার সমর্থকরা। ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তকে তাত্ক্ষণিকভাবে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দেন। তিনি এটাকে স্বাগতিক দেশের স্বার্থে এবং টুর্নামেন্টের উত্তেজনা ধরে রাখতে ‘ন্যায্য ও সঠিক সিদ্ধান্ত’ বলে মনে করেন। সমালোচকদের দাবি, ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের বাণিজ্য ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে ট্রাম্পের অদৃশ্য চাপ বা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কাছে মাথানত করেছে ফিফা। বিবিসি স্পোর্টস আরও বলছে, আমেরিকার ক্ষেত্রে ফিফা যেভাবে আইনের ফাঁকফোকর (ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর ধারা) বের করে শাস্তি মওকুফ করেছে, তা ফুটবল ইতিহাসের ফেয়ার প্লে-র নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখানোর শামিল। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের হেড কোচ মাওরিসিও পচেত্তিনো একে ‘ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন, ‘ওটা মোটেও লাল কার্ড পাওয়ার মতো ফাউল ছিল না। শাস্তিটা বড্ড বেশি কঠোর হয়ে গিয়েছিল। আমরা এখানে কোনো দয়া পাচ্ছি না, আর আমরা মাঠের কোনো খারাপ মানুষও নই।’ চলতি বিশ্বকাপে ৩ গোল করে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার প্রধান ভরসা এই বেলোগান। তার সতীর্থরাও শুরুতে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার খবর বিশ্বাস করেননি। দলের ডিফেন্ডার ক্রিস রিচার্ডস বলেছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন আমরা প্রথম খবরটা দেখি, আমাদের দলের অনেকেই ভেবেছিল এটা বোধহয় কোনো এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ভুয়া খবর! শুরুতে অনেক প্রশ্ন থাকলেও দলের সবাই এখন দারুণ আনন্দিত।’ এদিকে স্বাগতিক মেক্সিকোর বিপক্ষে ৩-২ গোলের থ্রিলারে জিতে শেষ আটে উঠেছে ইংল্যান্ড। এই ম্যাচে লাল কার্ড দেখেছেন ইংলিশ ডিফেন্ডার জ্যারেল কুয়ান। তাই ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে ফিফাকে ধুয়ে দেন ইংলিশ কোচ টমাস টুখেল, ‘এর শুরু কোথায় আর শেষই বা কোথায়? আমরা কি লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারি, নাকি পারি না? আসলে হচ্ছেটা কী? প্রশ্ন হলো, লাইনটা কোথায় টানা হবে? আমার কাছে এর কোনো উত্তর নেই। এখন কি একটা হলুদ কার্ড ভুল মনে হলেও আমরা আপিল করব? এটা যে লাল কার্ড ছিল না, তা কে ঠিক করছে? ফিফার এই নিয়মের শেষ কোথায়, আমি জানি না।’ বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৯৭০ সালের পর এই প্রথম কোনো লাল কার্ড দেখা খেলোয়াড়কে পরের ম্যাচেই খেলার অনুমতি দেওয়া হলো। ফুটবলবোদ্ধারা মনে করছেন, ট্রাম্পের আমেরিকাকে খুশি করতে গিয়ে ফিফা নিজেদের নিয়মকানুনের যে বারোটা বাজিয়েছে, তার খেসারত আগামীতে দিতে হবে। আজ রাতে সিয়াটলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে বেলোগান যখন মাঠে নামবেন, তখন বিশ্ব ফুটবল মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে ফিফার এই ‘আমেরিকান প্রীতি’র দিকেই বেশি তাকিয়ে থাকবে।










