বিশ্বকাপ না জেতা কিংবদন্তি হয়ে রইলেন রোনালদো

সংগৃহীত ছবি
ছয়টি বিশ্বকাপ, অসংখ্য রেকর্ড, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ ফুটবলের প্রায় সব বড় ট্রফিই জিতেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কিন্তু যে ট্রফিটিকে ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মান বলা হয়, সেই বিশ্বকাপ কখনোই ছোঁয়া হলো না পর্তুগিজ মহাতারকার।
২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে শেষ ষোলোতে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে পর্তুগাল। যোগ করা সময়ে মিকেল মেরিনোর গোলে স্বপ্নভঙ্গ হয় রোনালদোদের। তাতেই শেষ হলো ৪১ বছর বয়সী রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়। আগেই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, এটিই হতে যাচ্ছে তার শেষ বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপ জয়ের অপূর্ণ স্বপ্ন রোনালদোকে জায়গা করে দিয়েছে এমন এক তালিকায়, যেখানে আছেন ফুটবল ইতিহাসের কয়েকজন সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়—যাদের ক্যারিয়ারও বিশ্বকাপ ট্রফি ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
রোনালদো
২০০৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিলেন রোনালদো। ২০২৬ পর্যন্ত টানা ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি গড়েছেন অনন্য নজির। এবারের আসরে গোল করে পুরুষদের ফুটবলে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম খেলোয়াড়ও হয়েছেন তিনি।
এবারই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোল করার আক্ষেপও ঘুচিয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। তবে ব্যক্তিগত সব অর্জনের পরও বিশ্বকাপে তাঁর সেরা সাফল্য রয়ে গেছে ২০০৬ সালের চতুর্থ স্থান। পরের পাঁচ আসর খেলেও আর কখনো সেমিফাইনালে ওঠা হয়নি পর্তুগালের।
রোনালদোর আগে যাদের স্বপ্নও অপূর্ণ
রোনালদোর নাম যোগ হয়েছে এমন সব কিংবদন্তির পাশে, যাদের অনেকেই ফুটবলের ইতিহাস বদলে দিয়েছেন, কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি জেতা হয়নি।
ইয়োহান ক্রুইফ
মাত্র একটি বিশ্বকাপ খেলেছিলেন ১৯৭৪ সালে। কিন্তু সেই এক আসরই তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্রে পরিণত করে। 'টোটাল ফুটবল'-এর প্রতীক হয়ে নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। যদিও ফাইনালে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত পশ্চিম জার্মানির কাছে ২-১ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়।
আলফ্রেদো দি স্তেফানো
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়েও বিশ্বকাপের মূল পর্বে একবারও খেলার সুযোগ পাননি দি স্তেফানো। আর্জেন্টিনায় জন্ম, পরে স্পেনের হয়ে খেললেও বিভিন্ন সময়ে মূল আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থতা, নিয়মকানুন ও চোটের কারণে বিশ্বকাপের মঞ্চে নামাই হয়নি তাঁর।
ফেরেঙ্ক পুসকাস
১৯৫৪ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত হাঙ্গেরি দলের নেতা ছিলেন পুসকাস। পুরো আসরে দাপট দেখিয়ে ফাইনালে উঠেছিল তাঁর দল। ফাইনালেও প্রথমে ২-০ গোলে এগিয়ে যায় হাঙ্গেরি। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে পশ্চিম জার্মানি ৩-২ ব্যবধানে জিতে নেয় শিরোপা। ইতিহাসে যা 'বার্নের অলৌকিক ঘটনা' নামে পরিচিত।
ইউসেবিও
রোনালদোর আগে পর্তুগালের সর্বকালের সেরা ফুটবলার বলা হত ইউসেবিওকে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচে ৯ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে চার গোল করে দলকে অবিশ্বাস্য জয়ও এনে দেন। তবে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।
পাওলো মালদিনি
১৯৯০ থেকে ২০০২—চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন ইতালির কিংবদন্তি ডিফেন্ডার। ১৯৯৪ সালে ফাইনাল পর্যন্ত উঠেও টাইব্রেকারে ব্রাজিলের কাছে হারতে হয় ইতালিকে। দীর্ঘদিন বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ২,২১৭ মিনিট খেলার রেকর্ডও ছিল তাঁর, যা ভাঙেন লিওনেল মেসি, ২০২২ সালের ফাইনালে।
নেইমার
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে হতাশার রাজপুত্র তিনি। তাকে ঘিরে ২০০২ বিশ্বকাপ পরবর্তী ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল। অথচ সেই স্বপ্ন ভেঙেছে ইনজুরিতে। ইনজুরিই নেইমারের খেলোয়াড়ি জীবন ছোট করেছে অনেকটা। ২০১৪ থেকে ২০২৬ , চার বিশ্বকাপ খেলেছেন নেইমার। কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের প্রশ্নে ২০১৪ বাদে আর কখনই তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে পারেনি ব্রাজিল। মেসি-রোনালদো দ্বৈরত্বের সময়ে জন্মেছিলেন বলে হাতে ওঠেনি একটি ব্যালন ডি অর’ও। তবুও ৮০টি আন্তর্জাতিক গোলে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ স্কোরারের রেকর্ডটা তার দখলে।
অপূর্ণতার তালিকা আরও দীর্ঘ
এই তালিকায় শুধু রোনালদো, ক্রুইফ বা মালদিনিই নন। বিশ্বকাপ না জিতেও কিংবদন্তি হয়ে থাকা ফুটবলারদের মধ্যে আছেন রবার্তো বাজ্জিও, জিকো, সোক্রাতেস, ফালকাও, মিশেল প্লাতিনি, জর্জ বেস্ট, লেভ ইয়াসিন।
তবে রোনালদোর নাম এই তালিকায় যোগ হওয়ার বিশেষ তাৎপর্য আছে। কারণ তিনি ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন, অসংখ্য ব্যক্তিগত ও দলীয় শিরোপা জিতেছেন, ভেঙেছেন একের পর এক রেকর্ড। তবু ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি তাঁর ক্যারিয়ারে অধরাই থেকে গেল।
বিশ্বকাপ—এটাই হয়ে রইল ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা।




