ঠাট্টায় জন্মানো ‘ভোজিনহা’ নামটাই এখন ইতিহাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কেপ ভার্দের ছোট্ট দ্বীপে বিকালের আলো নেমে এলে রাস্তাগুলোই হয়ে ওঠে ফুটবল মাঠ। সেখানে বয়সের কোনো হিসাব থাকে না। বড়দের ভিড়ে এক বালক বল নিয়ে নেমে পড়ত। সে হারতে জানত না। বল পায়ে ছিল দুর্দান্ত, জেদ ছিল আরও বেশি। তাই প্রতিদিনই লাথি খেত, ধাক্কা খেত, মাটিতে পড়ে যেত। শেষে অভিমানে চোখ-মুখ লাল করে ছুটে যেত দাদা-দাদির কাছে। এলাকার সবাই তখন হেসে বলত, ‘দেখো, আবার দাদির কাছে নালিশ করতে যাচ্ছে।’ সেই ঠাট্টা থেকেই জন্ম নিয়েছিল একটি নাম— ‘ভোজিনহা’। কেপ ভার্দের ক্রেওল ভাষায় যার অর্থ ‘দাদি’।
ওই নামই ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বকাপ মঞ্চে। যে নাম একসময় ছিল পাড়ার ছেলেদের খুনসুটি, সেটিই হয়ে উঠল স্পেনকে কাঁদানো এক গোলকিপারের পরিচয়। রাতারাতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ‘হিরো’। ফলোয়ার সংখ্যা পাঁচ লাখ থেকে একলাফে উঠে গেছে দেড় কোটিতে। কেপ ভার্দের রাস্তার নাম বদলে হয়েছে ‘ভোজিনহা সড়ক’। আচ্ছা আর্জেন্টিনাও কি এই নাম নিয়ে ভাবছে?
অথচ ভোজিনহা তার নামই নয়, জন্ম সনদে লেখা— জোসিমার দিয়াস। তার বাবা ছিলেন ব্রাজিল ফুটবলের অন্ধভক্ত। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রাইটব্যাক জোসিমারের খেলা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, ছেলের নামও রাখতে চেয়েছিলেন তার নামে। যদিও প্রথম ইচ্ছা ছিল আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি হোর্হে ভালদানোর নাম অনুসরণ করা। কিন্তু সরকারি নিবন্ধনের নিয়মে সেটি আর সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত জোসিমার নামটি থেকে যায়। তবে পৃথিবী তাকে চিনেছে অন্য নামে— ভোজিনহা।
২০২৪ সালে ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শৈশবের কথা মনে করে ভোজিনহা হেসে বলেছিলেন, ‘আমাদের এলাকায় আমার সঙ্গে যারা খেলত, তারা সবাই বয়সে বড় ছিল। আমি ভালো খেলতাম, হার মানতে চাইতাম না। তাই তারা আমাকে প্রচুর লাথি মারত। যখন কিছুই করতে পারতাম না, রাগ করে দাদা-দাদির কাছে চলে যেতাম। তখন সবাই বলত, আমি দাদির কাছে নালিশ করতে যাচ্ছি।’
যে বয়সে বিশ্বের অনেক ফুটবলার ইউরোপের বড় ক্লাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন, সেই বয়সে ভোজিনহা ফুটবলের ধারেকাছেও ছিলেন না। ২৫ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো ঘর ছেড়ে পাড়ি জমান অ্যাঙ্গোলার ক্লাব প্রোগ্রেসোতে। এরপর সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া, মলদোভা ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঠিকানা হয় পর্তুগাল। এখন খেলছেন পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেসে। ধীরে চলা এই যাত্রায় কখনো শিরোনামে ছিলেন না, ছিল শুধু নীরব পরিশ্রম।
ভোজিনহা তার নামই নয়, জন্ম সনদে লেখা— জোসিমার দিয়াস। তার বাবা ছিলেন ব্রাজিল ফুটবলের অন্ধভক্ত। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রাইটব্যাক জোসিমারের খেলা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, ছেলের নামও রাখতে চেয়েছিলেন তার নামে
২০১২ সালে কেপ ভার্দের জার্সিতে তার অভিষেক। খেলেছেন চারটি আফ্রিকা কাপ অব নেশনস। দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ধারাবাহিক প্রজন্মের অন্যতম মুখ। কিন্তু বিশ্বকাপের ঠিক আগেই সবকিছু ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। ২০২৫ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের বাছাই পর্বের দল থেকে বাদ পড়ার হতাশায় বিদায় বলতে চেয়েছিলেন জাতীয় দলকে। গোলকিপার ডটকমকে সে কথা বলেছেন এভাবে, ‘সময়টা খুব কঠিন ছিল। আমি জাতীয় দল ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছিলাম। কিন্তু সতীর্থরা আমাকে থামিয়েছিল। তারা বলেছিল, বিশ্বকাপের জন্য অন্তত থেকে যাও।’
সেদিন তিনি অবসর নিলে হয়তো বিশ্বকাপ পেত না তার সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটি। এক রাতে ফুটবল দুনিয়ায় নায়ক বনে গেলেন ভোজিনহা। বিশ্বকাপের হট ফেভারিট স্পেনকে আটকে দেন অবিশ্বাস্য সব সেভে। রূপকথার শেষ এখানেই নয়। প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে নেমেই কেপ ভার্দে নকআউটে। শেষ ৩২-এ তাদের সামনে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ভোজিনহা জানেন, লিওনেল মেসিরা পরিষ্কার ফেভারিট। তাই তার কাছে এই ম্যাচের অর্থ অন্যরকম, ‘আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসির বিপক্ষে মাঠে নামা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই স্বপ্ন।’
সামনে আর্জেন্টিনা। সামনে নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ। ফল যা-ই হোক, ভোজিনহার জীবনের গল্প প্রমাণ করে দিয়েছে— ফুটবলে সবচেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনা কখনো স্কোরলাইনে লেখা থাকে না, লেখা থাকে মানুষের জীবনে।





