যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল বিপ্লব

১৯৯৪ ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল যুক্তরাষ্ট্র। অথচ টুর্নামেন্টের মাঝপথেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি মানুষ জানতেনই না ব্যাপারটা! ২০২৬ বিশ্বকাপে বদলে গেছে পুরো চিত্র। কানাডা, মেক্সিকোর সঙ্গে এবার তারা যৌথ আয়োজক। তিন দেশের টুর্নামেন্ট হলেও বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা চলছে যুক্তরাষ্ট্রেই। কারণ, ফুটবল বিপ্লব ঘটে গেছে দেশটিতে। ‘অচেনা’ ফুটবল এখন দেশটিতে তৃতীয় জনপ্রিয় খেলা।
১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ মৌসুমে পেলে খেলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে ঘরোয়া ফুটবলের ক্লাব নিউ ইয়র্ক কসমসে। পেলের পথ ধরে এখানকার লিগে খেলেছেন কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ, ইউসেবিও, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, ববি মুর, জর্জ বেস্ট, গর্ডন ব্যাঙ্কসের মতো কিংবদন্তি। পেলে নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার টাকার দরকার না হলে যুক্তরাষ্ট্রে খেলতাম না।’ মানে যুক্তরাষ্ট্র তখন থেকেই টাকা ঢেলেছে দেশটিতে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে।
পেলে-বেকেনবাওয়াররা যে শুরুটা করেছিলেন, সেই জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪ বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার পর। বিশ্বকাপ সামনে রেখে ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মেজর লিগ সকার (এমএলএস)। ১৯৯৬ সালে শুধু ১২ দল নিয়ে শুরু হয় এই টুর্নামেন্ট। ১২ থেকে বেড়ে এমএলএসের দল এখন ৩০টি। ইস্টার্ন কনফারেন্সে ১৫ আর ওয়েস্টার্ন কনফারেন্সের দল ১৫টি করে।
ডেভিড বেকহাম ২০০৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সিতে আসার পর বাড়তে থাকে উন্মাদনা। এরপর তিনি ক্লাব মালিক হয়েছেন ইন্টার মায়ামির। সেই ক্লাবে লিওনেল মেসি নাম লেখানোর পর হুহু করে বেড়েছে ফুটবলের জনপ্রিয়তা। তা এতটাই যে, মেসির জন্য বিপক্ষ ক্লাবগুলো মায়ামির সঙ্গে নিজেদের ম্যাচ রাখছে বড় স্টেডিয়ামে। ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ দর্শক আসনের গ্যালারির টিকিটও বিক্রি হয়ে যাচ্ছে চোখের পলকে।
এর পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে কয়েক দশকের বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক তারকাদের আগমন এবং আমেরিকান বাজারের সেই চেনা কৌশল— ফুটবলকে গণবিনোদনে রূপ দেওয়া।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল অন্যতম প্রধান ও উদীয়মান বাজারে রূপান্তরিত হয়েছে। ব্রাজিল ক্লিভল্যান্ডে মুখোমুখি হয়েছিল মিসরের। সেই ম্যাচের গ্যালারি ছিল কানায় কানায় ভরা। আর্জেন্টিনার সঙ্গে দুর্বল দল হন্ডুরাসের ৭০ শতাংশ টিকিট বিক্রি হয়েছিল ম্যাচ শুরুর এক মাস আগেই! অন্য দেশের প্রীতি ম্যাচেও ভরা ছিল গ্যালারি।
এই রূপান্তর ২০২৩ সালে এমএলএসে লিওনেল মেসির আসার অনেক আগে থেকেই শুরু। এফসি সিরিজের প্রধান নির্বাহী ও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমেরিকান বাজারে বড় বড় ক্লাব ও জাতীয় দলগুলোকে নিয়ে আসার অন্যতম মূল কারিগর রিকার্ডো ভিলার। তিনি এই পরিবর্তন নিয়ে বলেছেন, ‘এর সব কৃতিত্ব মেজর লিগ সকারের। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলের উন্নয়নের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করেছিল। ১৯৯৬ সালে এমএলএসের যাত্রা শুরুর পর দারুণ গতিতে এগিয়ে যায় ফুটবল। আমি এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, ড্রাফটের মাধ্যমে ফুটবল খেলেছি এবং খুব কাছ থেকে এই বিবর্তন দেখেছি। আমরা এখনো ইউরোপের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি, তবে আজ এখানে অনেক বেশি সুসংগঠিত একটি ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ রয়েছে।’
বছরের পর বছর ধরে আমেরিকানরা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ এবং ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর সফরের মাধ্যমেই ফুটবল উপভোগ করত। এই প্রেক্ষাপটেই জন্ম পুরনো ‘ফ্লোরিডা কাপ’-এর। যার উদ্দেশ্য তুলনামূলকভাবে অনুচ্চারিত একটি বাজারকে অন্বেষণ করা। ব্রাজিল ও জার্মানির ক্লাবগুলো শুরুতেই এসেছিল অরল্যান্ডোতে, যা পর্যটনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আর তৈরি করেছিল কোটি কোটি ডলারের রাজস্ব। বড় ক্লাবগুলো আসতে থাকায় পুরো শহরের অর্থনীতি ও পরিবেশ জড়িয়ে পড়ে এর সঙ্গে।
টুর্নামেন্টটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি করোনা মহামারীর কঠিন সময়েও টিকে থাকে। ২০২০ সালে অরল্যান্ডো শহরকেই একটি সুরক্ষিত ‘বায়ো-বাবল’ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ফলে এনবিএ এবং এমএলএস শুরু হয় আবারও। এর কিছুদিন পরই ফ্লোরিডা কাপ খোলস বদলে নতুন নামকরণে করা হয় ‘এফসি সিরিজ’।
এর উদ্দেশ্য ছিল ফ্লোরিডার বাইরেও এর বিস্তার ঘটানো। চেলসি, আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার সিটি, রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার মতো ক্লাবগুলোর নিউ ইয়র্ক, অরল্যান্ডো, ওহাইও এবং টেক্সাসের মতো কৌশলগত বাজারগুলোয় ঢুকে পড়ে এরপর। ক্লাবগুলোর পাশাপাশি এফসি সিরিজ তাদের ‘রোড টু ২০২৬’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে জাতীয় দলগুলোর পেছনেও বিনিয়োগ করা শুরু করেছে।
গত মার্চে অনুষ্ঠিত প্রীতি ম্যাচগুলো সফল হয়েছিল বেশ। এ মাসের ম্যাচগুলোও সফল হয়েছে। গত ফিফা আন্তর্জাতিক বিরতিতে ব্রাজিল দল ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে নিউ জার্সি ও বোস্টন সফর করেছিল, যেখানে স্থানীয় দর্শকের উপচে পড়া ভিড় ছিল।
এই কৌশলের অন্যতম প্রধান দিক ছিল এনএফএলের কিছু বড় স্টেডিয়াম বাদ দিয়ে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশাল অবকাঠামোকে কাজে লাগানো। যেমন টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেডিয়ামে ১ লাখের বেশি মানুষের বসার জায়গা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম বা এমনকি এমএলএস স্টেডিয়ামগুলোর চেয়েও আকারে বড়।
একটা সময় ছেলেদের ফুটবল বলতে গেলে অস্তিত্বহীন ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। অনেকেই ফুটবলকে মেয়েদের খেলা হিসেবে দেখতেন। এখন এমএলএস নারীদের চেয়ে পুরুষদের ফুটবলে বেশি বিনিয়োগ করছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াব্যবস্থা এখনো খেলোয়াড় তৈরির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। মেসির আগমন এ প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে। মাঠের ভেতরের পারফরম্যান্সের চেয়েও বেশি, এই আর্জেন্টাইন তারকা আমেরিকানদের সাংস্কৃতিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলতে সাহায্য করেছেন। উইল স্মিথ, কিম কার্দাশিয়ানের মতো তারকারা এখন আসছেন ফুটবল ম্যাচ দেখতে।
আমেরিকানরা খেলার এই জাঁকজমকপূর্ণ বিনোদনের দিকটি বেশ পছন্দ করেন। আর এখানেই মেসি ফুটবলকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন। ফুটবল এখন এনএফএল, এনবিএ, বেসবল ও হকির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
এ বছরের জানুয়ারিতে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ জরিপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় খেলা নিয়ে। বিস্ময়করভাবে বেসবলকে পেছনে ফেলে তিন নম্বরে উঠে এসেছে ফুটবল। শীর্ষে আছে এনএফএল আর দুইয়ে বাস্কেটবল। ১৯৯৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত অগ্রগতির এই যাত্রাটা এক কথায় অবিশ্বাস্য।




