অসহায়দের ঠিকানা মারুফের আশ্রম

কুড়িগ্রামের উলিপুরের বাসিন্দা মারুফ কেইন চাকরি করতেন দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মিশনারি ল্যাম্ব হাসপাতালে। মানুষকে সুস্থ করে তোলার কাজ করতে গিয়ে খেয়াল করলেন পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশনের প্ল্যাটফর্মে নানা ধরনের ভাসমান মানুষ। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন, শরীর থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। ভিড়তে চান না কেউ তাদের কাছে।
২০১৪ সালের কথা। পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশন স্টেশনে কোনো এক কাজে গিয়েছিলেন মারুফ। প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করার সময় গোঙানির শব্দ পান। খেয়াল করলেন কাঁতরাচ্ছেন অসুস্থ এক বৃদ্ধা। শরীরের নানা জায়গায় ক্ষত। দুর্গন্ধের কারণে বেশ দূর দিয়েই নাক চেপে চলে যাচ্ছেন মানুষ। এগিয়ে গেলেন মারুফ। বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলেন ভাড়া বাসায়। সুস্থ করে তুললেন পরিচর্যার মাধ্যমে। এখান থেকেই মানুষের প্রতি ভালোবাসার গল্পের শুরু তার।
এরপর শুধু রেলস্টেশনেই নয়— এমন ঠিকানাহীন অসুস্থ-অপ্রকৃতিস্থ মানুষ যেখানেই দেখেন, উদ্ধার করে নিয়ে আসেন মারুফ। এসব অসুস্থ কিংবা প্রতিবন্ধীকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি নিজের হাতে গোসল করানো, খাওয়ানোসহ সেবা দিয়ে করে তোলেন সুস্থ। তবে এ কাজে প্রথমদিকে পড়তে হয়েছে বেশ প্রতিবন্ধকতার মুখে। প্রতিবন্ধী ও শরীরের ঘা থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোয় তাদের জন্য ভাড়ায় বাসা পাচ্ছিলেন না।
একসময় চাকরি ছেড়ে এই মানবিক কাজে পুরোপুরি যুক্ত হন মারুফ।
মারুফ একখণ্ড জমি কিনেছিলেন রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের হাসিনানগরে। সেখানেই চালু করেন ঠিকানাহীন মানুষের জন্য আশ্রম। এ প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয় গ্লোরি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা। শত চেষ্টা করেও মারুফকে এ কাজ থেকে ফেরাতে না পেরে একসময় স্ত্রী মরিয়ম বেগমও হাঁটলেন মারুফের পথে। এখন স্বামীর সঙ্গে তিনিও আশ্রমে অসুস্থদের সেবা দেন। তিনি বললেন, ‘স্বামীকে ফেরানোর চেষ্টা করেছিলাম। এখন মনে হয় আমার সেই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।’
সম্প্রতি আশ্রমে গিয়ে দেখা যায়, পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম পরিবেশে গড়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাঁচটি পাকা কক্ষে অন্তত ২৫ জনের থাকার জায়গা, চারপাশে ফল-ফুলের বাগান। নাম-ঠিকানা না জানা ১৮ জন আছেন সেখানে। এর মধ্যে ১২ জনই নারী। স্বাভাবিক নন কেউ। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন কেউ, কেউবা হাসছেন। হাঁটাচলা করতে অক্ষম, দৃষ্টিহীনসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধীর সংখ্যাই বেশি।
সবার সঙ্গে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন এখানকার বাসিন্দা উমা অধিকারী (৬৫)। তিনি নাম ছাড়া আর কিছু বলতে পারেননি। বিভিন্ন এলাকা থেকে অসহায় অবস্থায় উদ্ধার করে এ পর্যন্ত এই আশ্রমে আনা হয়েছে ৮২ নারীসহ ৯৭ জনকে। এর মধ্যে মারা গেছেন ৩০ জন। স্বজনদের খুঁজে পাওয়ায় সুস্থ করে নিজেদের বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়েছে ৪৯ জনকে।
মারুফ কেইন জানালেন, যেসব অসুস্থ মানুষ রাস্তাঘাটে পড়ে থাকেন, প্রথমে তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসাসেবাসহ যত্নের মাধ্যমে সুস্থ করে তোলার পর খোঁজা হয় পরিচয়। পরিচয় পেলে হস্তান্তর করা হয় স্বজনদের কাছে। যাদের পরিচয় মেলে না, এই আশ্রমই হয় তাদের ঠিকানা। আশ্রমটি চলে সাধারণ মানুষের সহযোগিতায়। এটি পরিচালনায় রয়েছে ৩১ সদস্যের একটি কমিটি।
মারুফ জানালেন, দুস্থ ও পীড়িতদের সেবায় বিশেষ অবদানের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে মারুফকে ২০২৫ সালে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এই আশ্রম এখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি পথের ধারে পড়ে থাকা পরিচয়হীন মানুষের বেঁচে থাকার নতুন ঠিকানা।




