‘আল্লায় দেখবে’ বলে বের হওয়া আশরাফুল আর ফেরেননি

নিহত জুলাই যোদ্ধা আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী লাবনী আক্তার ইতি ও মেয়ে ফারিহা তাবাসুম ফারহা। ছবি: আগামীর সময়
‘আল্লায় দেখবে’ বলে জুলাই আন্দোলনে যোগ দিতে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন কুষ্টিয়ার আশরাফুল ইসলাম। এরপর আর জীবিত ফিরে আসেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তিনি। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার, পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন তার স্ত্রী লাবনী আক্তার ইতি।
স্বামীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইতি বলেন, ‘১২ বছর ৯ মাসের সংসারে একটা দিনও বাপের বাড়ি কাটাতে দেয়নি।’ তিনি জানান, আশরাফুল পরম যত্নে দুই সন্তানকে নিয়ে গড়া ছোট্ট সংসারটি আগলে রেখেছিলেন।
ইতির ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাসায় ফেরেন আশরাফুল। চারদিকে তখন আন্দোলনের উত্তাল পরিবেশ। ঘরে বসে থাকতে না পেরে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনিও। স্বামীকে আটকে রাখতে চেয়ে তিনি আকুতি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার যদি কিছু হয়ে যায়, আমরা কি করে থাকবো?’ জবাবে আশরাফুল শুধু বলেছিলেন, ‘আল্লায় দেখবে।’
পরদিন ৫ আগস্ট সকালে আন্দোলনে যাওয়ার সময়ও তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন স্ত্রী। কিন্তু আশরাফুল বিদায়ের আগে বলেছিলেন, ‘ইতি আমি তো চলে যাচ্ছি, যদি আমার কিছু হয়ে যায় তুমি আমার ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাড়ি থাইকো। যদি আমি আন্দোলনে যাই, যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তুমি দেখো আমার শহীদে মৃত্যু হবে।’
ইতির দাবি, সেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন তার স্বামী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘প্রকাশ্যে গুলি করা পুলিশ সদস্যরা কীভাবে এখনও চাকরিতে বহাল থাকে?’ একই সঙ্গে দোষীদের দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
আশরাফুল ইসলামের ছয় বছরের মেয়ে ফারিহা তাবাসুম ফারহা এখনও থাকে বাবার অপেক্ষায়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, প্রতি সপ্তাহে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, ঘুরতে বের হওয়া কিংবা কাজ শেষে ফল কিনে আনা ছিল আশরাফুলের নিয়মিত অভ্যাস। বাবাকে স্মরণ করে ছোট্ট ফারহা বলে, ‘বাবা বলতেন, আমি তোমার জন্য মাল্টা আনতে যাচ্ছি।’ বাবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি মেনে নিতে না পেরে সে প্রশ্ন করে, ‘কোথায় আমার বাবা? কত সময় পেরিয়ে গেল ফিরে এলো না। কখনো তো আমার সঙ্গে এমন করেনি। আমার বাবা কি তবে লাশ হয়ে গেছে?’
পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলি, টিয়ারশেল এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় আশরাফুল ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তি নিহত হন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনে কুষ্টিয়ার আরও কয়েকজন বাসিন্দাও প্রাণ হারান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী সংগঠক এবং গণঅধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদ মন্তব্য করেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান হলেও আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। তার ভাষ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা দায়িত্বশীলরা আহতদের চিকিৎসা এবং পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সন্তোষজনক ব্যবস্থা নিতে পারেননি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পুলিশকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা এবং বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করার সুযোগও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। শহীদ পরিবার ও আহতদের যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত না হলে আন্দোলনের আত্মত্যাগের পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
লাবনী আক্তার ইতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং সন্তানদের মানুষ করার পূর্ণ দায়িত্ব আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বিচারহীনতার এই দীর্ঘ পথচলায় শহীদ পরিবারগুলোর চাওয়া একটাই, খুনিদের দ্রুত বিচার হোক এবং রাষ্ট্র তাদের প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত করুক।
কুষ্টিয়া সদর ইউএনও মো. হারুন অর রশিদ জানান, রাষ্ট্র ঘোষিত সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষতিপূরণ শহীদ পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিতে কাজ চলছে। পাশাপাশি আইনি সহায়তার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।






