ওলটপালটের দুই বছর

মাঠ ছিল শূন্য ফেডারেশনে ছিল স্থবিরতা
২০২৪ সালের ঠিক এই দিনে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের। ১৭ বছরের দীর্ঘ রাজত্বের পতনের প্রভাব পড়েছিল দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। তৈরি হয়েছিল বিশাল ক্ষতের। দুই বছরেও সেই ক্ষত পুরোপুরি শুকোয়নি। বর্তমান নির্বাচিত সরকার অগ্রাধিকার তালিকায় রাখায় মুমূর্ষু অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে ক্রীড়াঙ্গন।
৫ আগস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে। তার ১৬ মাস মেয়াদে ক্রীড়াঙ্গনে ঘটে বিপুল পরিবর্তন। দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের জেরে সবধরনের খেলাধুলায় নেমে আসে স্থবিরতা। প্রায় পাঁচ-ছয় মাস কোনো রকম খেলাধুলাই ঠিকমতো হয়নি।
ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোয় নেমে এসেছিল নেতৃত্বশূন্যতা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ফেডারেশনগুলোর অনেক কর্মকর্তা গা-ঢাকা দেন; অনেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের খোঁজই মেলেনি। তা ছাড়া ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সের বিভিন্ন ক্রীড়া স্থাপনায় বসেছিল সেনাবাহিনীর ক্যাম্প। দেড় বছরের বেশি সময় অনেক খেলাই নিয়মিত হয়নি।
আসিফ মাহমুদ ক্রীড়াঙ্গনের স্থবিরতা কাটাতে গঠন করেছিলেন সার্চ কমিটি। ফেডারেশনগুলোর কার্যক্রম নিয়ে সংস্কার প্রস্তাব দিতে গঠন করা হলেও সার্চ কমিটির আগ্রহ ছিল বিভিন্ন ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটি গঠনে। অর্ধশতাধিক কমিটি বানিয়ে নানাভাবে বিতর্কিত হয়েছে এই সার্চ কমিটি।
সার্চ কমিটি অনেক বিতর্কিত লোকজনকে বিভিন্ন ফেডারেশনে পদ দেয়। সেই অ্যাডহক কমিটির ফেডারেশনগুলো পরে প্রতিদান দেয় সার্চ কমিটির আহ্বায়ক জোবায়দুর রহমান রানা ও সদস্য মেজর ইমরোজকে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বের চেয়ারে বসিয়ে। বিওএর নির্বাচনী নাটকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রানা হয়েছেন মহাসচিব, ইমরোজ সহসভাপতি।
শুধু সার্চ কমিটি নয়, এন্তার অভিযোগ আছে আসিফ মাহমুদের দুই সহকারীকে নিয়েও। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালে আসিফের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ও প্রেস সচিব মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে আছে দুর্নীতি, অনিয়ম, টেন্ডারবাজির একাধিক অভিযোগ। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন ও জেলা-বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থায় ছাত্র প্রতিনিধিদের নামে নিজের লোক অন্তর্ভুক্ত করেও সমালোচিত হন আসিফ মাহমুদ।
আন্দোলনে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে দেশের ঘরোয়া ফুটবল। আবাহনীর মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে হামলা, ভাঙচুর ও লুটের ঘটনা ঘটে। অনেক পৃষ্ঠপোষক ও পরিচালক মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে ক্লাবটি। বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণাধীন ক্রীড়া কমপ্লেক্সের কাজ। তারপরও আবাহনী মাঠে কোনোমতে টিকে গেলেও বিলুপ্ত হয়ে যায় শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র ও শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব।
দুটি ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতা করত বসুন্ধরা গ্রুপ। হাসিনা সরকার পতনের পর এই শিল্পগোষ্ঠী অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। ফলে দুটি ক্লাব ফুটবল থেকে একেবারেই ঝরে পড়ে। বসুন্ধরা নিজেদের ক্লাব বসুন্ধরা কিংস নিয়েও সংকটে আছে। বেতন বকেয়া পড়ায় ফিফা থেকে নেমে এসেছে খেলোয়াড় নিবন্ধন নিষেধাজ্ঞা। ফলে আগামী মৌসুমে দল গড়াই অনিশ্চিত ছয়বারের লিগজয়ীদের।
গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত হওয়া বিএনপি সরকার অবশ্য ক্রীড়াঙ্গনকে রেখেছে অগ্রাধিকার তালিকায়। সাবেক তারকা ফুটবলার আমিনুল হক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন খেলার ৫০০ ক্রীড়াবিদকে বেতনের আওতায় আনা, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস আয়োজনের মাধ্যমে তৃণমূল থেকে প্রতিভা তুলে আনা, স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি থেকে চারটি খেলা বাধ্যতামূলক করার মতো উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে।
সম্প্রতি সার্চ কমিটির দেওয়া ২৭টি ক্রীড়া ফেডারেশনে পুরনো কমিটি ভেঙে গঠন করা হয়েছে নতুন অ্যাডহক কমিটি। ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাদের। খেলাকে পেশায় রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে নেওয়া আমিনুলের উদ্যোগগুলো আশার আলো দেখাচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনকে।




