জর্ডানের সতর্কবার্তা
আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরায়েলের দখলচেষ্টার আশঙ্কা
- জরুরি বৈঠকে আরব ও ইসলামি দেশগুলো
- ধর্মীয় সংঘাতের আশঙ্কা আম্মানের

ছবি: রয়টার্স
জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ ও ডোম অব দ্য রক ঘিরে থাকা পবিত্র প্রাঙ্গণে ইসরায়েলের দখলচেষ্টার ‘আসন্ন’ ঝুঁকির কথা জানিয়ে সতর্ক করেছে জর্ডান। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বুধবার আরব লীগভুক্ত দেশগুলোর পাশাপাশি তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছে দেশটি। জর্ডানের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা গোটা মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি বলেছেন, আল-আকসা প্রাঙ্গণের বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তনের যেকোনো চেষ্টা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তার ভাষায়, জেরুজালেম এখন একটি ‘বারুদের স্তূপে’ পরিণত হয়েছে।
জর্ডানের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি সরকারের সমর্থনপুষ্ট কট্টরপন্থি ইহুদি গোষ্ঠীগুলো আল-আকসা প্রাঙ্গণে যাতায়াত বেড়েছে। বিদ্যমান ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী সেখানে মুসলমানরাই শুধু নামাজ আদায় করতে পারেন। কিন্তু ২৩ জুলাই জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বে দুই হাজারের বেশি কট্টরপন্থি ইহুদি ওই প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার পালন করেন। জর্ডানের ভাষ্য, আধুনিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে গুরুতর নিয়ম লঙ্ঘনের একটি।
এ ছাড়া টেম্পল মাউন্টের জন্য বিশেষ পুলিশ ইউনিটে ইহুদিদের নিয়োগ কার্যক্রমও আম্মানের (জর্ডানের রাজধান) উদ্বেগ বৃদ্ধির একটি বিশেষ কারণ। সেপ্টেম্বরে ইহুদিদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঘিরে আরও উসকানিমূলক পদক্ষেপের আশঙ্কা করছে দেশটি। একই সময়ে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। বলা যায় সে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি জোট টিকে থাকার জন্য যতটা সম্ভব লড়াই করবে।
আল-আকসা প্রাঙ্গণের তত্ত্বাবধানে জর্ডানের ভূমিকার ইতিহাস দীর্ঘ। অটোমান আমল থেকে চলে আসছে এ দায়িত্ব। ১৮৭৮ সালের বার্লিন চুক্তিতে ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর বিদ্যমান অবস্থার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পরও সেই ভূমিকা বহাল থাকে। ১৯৯৪ সালের ইসরায়েল-জর্ডান শান্তি চুক্তিতেও জর্ডানের অভিভাবকত্ব পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
জর্ডানের উদ্বেগ শুধু জেরুজালেমেই সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নীতিকেও দেশটি বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে জর্ডানে ঠেলে দেওয়ার কোনো চেষ্টা একেবারেই মেনে নেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাফাদি। তার ভাষায়, এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে এবং পুরো অঞ্চলের সংকট আরও তীব্র করে তুলবে।
বর্তমানে জর্ডানের প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ মানুষের বেশি অর্ধেকই পূর্ববর্তী সময়ে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের বংশধর। নতুন করে বড় আকারের বাস্তুচ্যুতি দেশটির অর্থনীতি, জনসংখ্যার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সরকার।
দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়েছে পানি বণ্টন ইস্যুতেও। ২০২১ সালের একটি চুক্তি নবায়ন না করে ইসরায়েল আগের চুক্তির আওতায় কম পরিমাণ পানি সরবরাহ করছে। জর্ডানের অভিযোগ, গাজা যুদ্ধ নিয়ে তাদের সমালোচনার জবাব হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জর্ডানের সংসদ সদস্য ও উম্মাহ পার্টির মুখপাত্র দিমা তাহবুবের দাবি, পশ্চিম তীর দখলের পরিকল্পনা, পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধ এবং আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রতিদিনের অনুপ্রবেশ—সব মিলিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার বিরোধিতা দেশটিতে দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, ইসরায়েলের পদক্ষেপ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক চাপ আরও জোরালো হওয়া দরকার।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়েও জর্ডানে বিতর্ক বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শত শত রাজনীতিক, আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এক খোলা চিঠিতে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিদেশি সেনা উপস্থিতি জর্ডানকে অপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং দেশটিকে এমন এক আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে, যার সাথে জর্ডানের সম্পৃক্ততা নেই।




