৩৬ জুলাই
সেদিন ছিল স্বপ্নের স্বপ্নপূরণ কতদূর
- শহীদ পরিবার, আহত ও সাধারণ মানুষের মতে রাষ্ট্র সংস্কারের ধীরগতি প্রত্যাশার সঙ্গে মেলাতে পারছে না প্রাপ্তির সমীকরণ
- শহীদ পরিবারের বড় আক্ষেপ দুই বছরেও গণঅভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ সম্পন্ন না হওয়া
- আন্দোলনের মূল চেতনা বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের আলোচনা ছাপিয়ে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে এখন ক্ষমতার সমীকরণ, নির্বাচন ও রাজনৈতিক অবস্থান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কেটে গেছে দুই বছর। রাজপথের রক্ত ধুয়ে নিয়েছে বৃষ্টি, দেয়ালের অনেক স্লোগান মুছে দিয়েছে সময়। কিন্তু ‘জুলাই’ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। অসংখ্য পরিবারের কাছে সেই সময় থমকে আছে আজও। কোথাও ছেলের পড়ার টেবিলটি সাজানো আগের মতোই, বুকশেলফে জমছে ধুলো, আলনায় ঝুলছে শেষবার পরা শার্ট। কোথাওবা হুইলচেয়ারে বসে নতুন করে জীবনকে চিনতে শিখছেন তরুণ। কেউ হারিয়েছেন একটি চোখ, কেউবা একটি পা, কেউবা চিরতরে হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা। তাদের মতো স্বজনরাও আজও একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরেন। যে স্বপ্নের জন্য এত জীবন, এত রক্ত, কতটা পূরণ হলো সেই স্বপ্ন?
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই রূপ নেয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া, শ্রমিক, রিকশাচালক, শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, অভিভাবক— সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষ দাঁড়িয়েছিলেন এক কাতারে। শুরুতে দাবি ছিল কোটাব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু আন্দোলন যত বিস্তৃত হয়েছে, ততই সামনে এসেছে রাষ্ট্রের চরিত্র, শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। একপর্যায়ে সেই আন্দোলন আর সীমাবদ্ধ থাকেনি একক কোনো দাবির মধ্যে, পরিণত হয় রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ে তোলার জনআকাঙ্ক্ষায়। শত শত প্রাণহানি, হাজারো আহত এবং অসংখ্য মানুষের স্থায়ী পঙ্গুত্বের বিনিময়ে যে অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল, তার মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে দীর্ঘস্থায়ী এক শাসনের। কিন্তু সেই বিজয়ের সঙ্গে জন্ম নেয় আরও বড় প্রত্যাশার। মানুষ বিশ্বাস করেছিল, এবার হয়তো বদলাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারা। প্রতিষ্ঠা পাবে আইনের শাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কার্যকর ব্যবস্থা, আরও জবাবদিহিমূলক হবে প্রশাসন, ভাঙবে রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আসবে দৃশ্যমান পরিবর্তন।
জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সাম্যের প্রশ্ন থেকে। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্য দূর করার দাবিই ছিল এর ভিত্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দাবি বিস্তৃত হয়ে পৌঁছায় রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নিয়ে আলোচনায়। কেন বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে? কেন প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে? কেন দুর্নীতি রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে শিকড় গেড়ে বসবে? কেন সাধারণ মানুষ অসহায় থাকবে বাজার সিন্ডিকেটের কাছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই একসময় লাখো মানুষ নেমেছিল রাজপথে।
দুই বছর পর সেই প্রত্যাশার দিকে ফিরে তাকালে ছবিটি একরৈখিক নয়। স্বৈরশাসনের পতনকে প্রায় সবাই একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে দেখছেন। তবে একই সঙ্গে আন্দোলনের সংগঠক, শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত যোদ্ধা, বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের অনেকেই মনে করছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা লাখো মানুষকে রাজপথে এনেছিল, তার বাস্তবায়ন এখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীর।
অনেকের কাছে জুলাই ছিল শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন নয়। এটি ছিল রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার ঐতিহাসিক সুযোগ। সে কারণেই প্রাণের ঝুঁকি জেনেও রাজপথ ছাড়েনি মানুষ। তাদের বিশ্বাস ছিল, এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই হয়তো জন্ম নেবে অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। সেই বিশ্বাসেরই প্রতীক হয়ে আছেন শহীদ নাফিস। দুই বছর পরও তার পড়ার টেবিলটি সাজানো আগের মতোই। বইগুলো যেখানে ছিল, আছে সেখানেই। মাঝেমধ্যে ধুলো ঝেড়ে দেন মা, কিন্তু বদলান না ঘরের কিছুই। তার বিশ্বাস, ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য জীবন দেয়নি; অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখেছিল একটি ভালো রাষ্ট্রের। ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চলার সময় তার পক্ষে সম্ভব ছিল না ঘরে বসে থাকা। আজও তিনি অপেক্ষা করেন— যে স্বপ্ন নিয়ে তার ছেলে রাজপথে গিয়েছিল, সেই স্বপ্ন কি একদিন হবে বাস্তব?
এ শুধু নাফিসের একার গল্প নয়। জুলাইয়ের শহীদদের অসংখ্য পরিবারও বয়ে বেড়াচ্ছে একই ধরনের প্রশ্ন। অন্যদিকে, আন্দোলনে আহত অনেকেই এখনো লড়ছেন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকার অনিশ্চয়তার সঙ্গে। কেউ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে পারেননি, কেউ হারিয়েছেন চাকরি, কেউ স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে চেষ্টা করছেন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার। গণঅভ্যুত্থানের মূল্য তাই শুধু শহীদের সংখ্যায় নয়। সেই মূল্য বহন করছে প্রতিদিন বেঁচে থাকা অসংখ্য মানুষ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মেহেরুন নেসা তানহার বাবা মোশাররফ হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন না হওয়াই তাদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। তার ভাষায়, যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে তাদের সন্তানরা জীবন উৎসর্গ করেছিল, তার অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেছে এখনো।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মাঝখানে এই ফারাকের কারণ কী— এ প্রশ্নের নেই একক কোনো উত্তর। আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, এমনকি গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্তদেরও মূল্যায়ন এক নয়। তবে প্রায় সবার বক্তব্যেই একটি বিষয় স্পষ্ট— স্বৈরশাসনের পতন ছিল একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা, কিন্তু সেই ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় সংস্কারে রূপ দেওয়ার পথটি হয়ে উঠেছে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন ও জটিল।
জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা রাখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুর রহীম মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য থেকেই সরে যাওয়া হয়েছে ধীরে ধীরে। তার ভাষায়, যে রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন মানুষকে রাজপথে এনেছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আলোচনার জায়গা দখল করেছে ক্ষমতার সমীকরণ, নির্বাচন ও রাজনৈতিক অবস্থান। ফলে যে প্রশ্নগুলো আন্দোলনের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেগুলো এখন আর নেই জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে।
জুলাইয়ে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আয়েশা খানম। তিনি বললেন, তাদের ছিল না কোনো ব্যক্তিগত লাভের প্রত্যাশা। তারা ভেবেছিলেন, সন্তানদের জন্য গড়ে উঠবে নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। কিন্তু দুই বছর পর তার মনে হয়, অনেক ক্ষেত্রে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিই আসছে ফিরে আবার।
গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। অনেকেই মনে করেন, পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে যাদের দিকে মানুষ তাকিয়েছিল, তাদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে হয়ে পড়েছে ক্ষমতার রাজনীতির অংশ। বিভিন্ন বিতর্ক, অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে আপসের ঘটনাগুলো প্রভাব ফেলেছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশায়ও।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক এবং সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ মনে করেন, জুলাইয়ের অসম্পূর্ণতার পুরো দায় ছাত্র নেতৃত্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা হবে। তার ভাষ্য, গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র সংস্কারের সুযোগ ছিল। উপদেষ্টা পরিষদ গঠনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হলেও তৈরি হয়নি প্রত্যাশিত জাতীয় ঐক্য। দলগুলোর একটি অংশ তখন জনগণের প্রত্যাশার চেয়ে ক্ষমতার প্রশ্নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এর ফলে যে সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল, তার অনেকটাই হয়েছে বিলম্বিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমও মনে করেন, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে এখনো রয়েছে বড় ব্যবধান। তার ভাষায়, আন্দোলনের পর যারা রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের সবার পক্ষেই সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হয়নি। ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রেই ছাপিয়ে গেছে জাতীয় স্বার্থকে। জুলাই সনদ, গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি পুরোপুরি।
পরিবর্তন না হওয়ার পেছনে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদের পক্ষেই রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকার সেই জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। নাহিদ বলেছেন, জনগণের স্পষ্ট সমর্থন থাকা সত্ত্বেও জুলাই সনদ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। তার ভাষায়, সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া দেশে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, সরকার পরিবর্তন তুলনামূলক দ্রুত ঘটানো সম্ভব হলেও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক আচরণ বদলাতে সময় লাগে। কিন্তু সেই সময়কে অর্থবহ করতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জবাবদিহি এবং জাতীয় ঐকমত্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আইনুল ইসলাম মনে করেন, যেকোনো গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রের গভীরে প্রোথিত সমস্যাগুলোর সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। তার ভাষায়, প্রকৃত প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র কি সঠিক পথে হাঁটছে? যদি সেই পথচলাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে মানুষের হতাশা আরও বাড়বে।
জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খানও মনে করেন, মাত্র দুই বছরে আমূল পরিবর্তনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তবে তিনি এও বললেন, ‘মানুষ অন্তত একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেখতে চেয়েছিল— রাষ্ট্র কোন পথে এগোচ্ছে, রাজনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা কী এবং গণঅভ্যুত্থানের চেতনা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে। সেই প্রশ্নগুলোর অনেক উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।’




