পঞ্চম লড়াইয়ে সরকার পতন

চব্বিশের জুলাইয়ের উত্তাল রাজপথে হাজারো তরুণের কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হচ্ছিল সরকার পতনের স্লোগান, তখন অনেকের চোখে সেটি ছিল হঠাৎ বিস্ফোরিত এক ছাত্র আন্দোলন। কিন্তু সেই বিস্ফোরণের আগুন জ্বলে ওঠেনি এক দিনে। তার বারুদ জমেছে বছরের পর বছর। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের রাজপথ, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা, আবরার ফাহাদের মৃত্যু, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরবিরোধী আন্দোলন, গুম-আয়নাঘর ইস্যুতে ছোট ছোট প্রতিবাদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠচক্র, ইতিহাসচর্চা আর অসংখ্য অনালোচিত কর্মসূচি— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রস্তুতি। তাদের ভাষায়, জুলাই ছিল সেই দীর্ঘ যাত্রার পঞ্চম এবং সবচেয়ে সফল অধ্যায়।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় ২০১৮ সালে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন প্রথমবারের মতো শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বৃহৎ ছাত্রসমাবেশ গড়ে তোলে। শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়— কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। দাবি ছিল কোটার সংস্কার। কিন্তু আন্দোলনের ভেতরেই জন্ম নেয় নতুন নেতৃত্ব, নতুন নেটওয়ার্ক এবং নতুন রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদের ভাষায়, তাদের রাজনৈতিক যাত্রার শুরু সেখান থেকেই। আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘অনেকে বলেন, আমাদের লড়াই ৩৬ দিনের। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। আমাদের লড়াই শুরু হয়েছে ২০১৮ সাল থেকে। এই ছয়-সাত বছরে আমরা একের পর এক আন্দোলন করেছি। প্রতিটি আন্দোলন আমাদের কিছু না কিছু শিখিয়েছে।’
কোটা আন্দোলনের কয়েক মাস না পেরোতেই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা। কয়েক দিনের জন্য ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে গাড়ির কাগজপত্র যাচাই— সবকিছুই চলে যায় শিক্ষার্থীদের হাতে। রাষ্ট্র বুঝতে পারে, সংগঠিত তরুণ সমাজ শুধু ক্যাম্পাসের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই।
আসিফ মাহমুদের মতে, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন তাদের শিখিয়েছে কীভাবে মানুষের আবেগকে আন্দোলনের শক্তিতে রূপ দিতে হয় এবং কীভাবে একটি ইস্যুকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়।
২০১৯ সালের অক্টোবরে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড সেই ধারাবাহিকতায় আরেকটি বড় মোড় হয়ে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাসের জেরে ছাত্রলীগের নির্যাতনে প্রাণ হারান আবরার। ঘটনার পর শুধু বুয়েট নয়, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদ।
আসিফ মাহমুদ বললেন, তারা সচেতনভাবেই আবরারের ঘটনাকে শুধু একটি ক্যাম্পাস হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখেননি। বরং রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। স্মরণসভা করতে গিয়ে শিকার হয়েছেন হামলার, গ্রেপ্তার হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন। তার নিজেরও দেড় মাস কাটে কারাগারে।
এরপর আসে ২০২১ সালের মোদির সফরবিরোধী আন্দোলন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে দেশ জুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া— বিভিন্ন স্থানে ঘটে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা। একই সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘আয়নাঘর’ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গুম ও বিচারবহির্ভূত নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছোট পরিসরে প্রতিবাদও সংগঠিত করেন কয়েকজন তরুণ। তাদের দাবি, সে সময় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকেই প্রকাশ্যে এমন কর্মসূচিতে এগিয়ে না এলেও তারা ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে ছিলেন।
আসিফ মাহমুদের ভাষায়, এই চারটি বড় আন্দোলনের বাইরেও ছিল আরও অসংখ্য ছোট কর্মসূচি। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগেও তারা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে কর্মসূচি পালন করেছেন। এসব অভিজ্ঞতাই জুলাইয়ের প্রস্তুতিকে করেছে পরিপক্ব।
মাঠের অভিজ্ঞতা ও পাঠচক্রে প্রশিক্ষণ: এই প্রজন্মের প্রস্তুতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠচক্রগুলো। টিএসসির চায়ের আড্ডা, ক্যাম্পাসের নিরিবিলি কোণ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে বসে চলত দীর্ঘ আলোচনা। কেউ পড়তেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, কেউ বিশ্ববিপ্লবের অভিজ্ঞতা, কেউ রাষ্ট্রচিন্তা, কেউ সামাজিক আন্দোলনের কৌশল। আলোচনা হতো কীভাবে জনসম্পৃক্ততা পায় একটি আন্দোলন, কীভাবে সফল হয় একটি কর্মসূচি, কীভাবে তৈরি করতে হয় জনমত।
এই ধারাবাহিকতারই একটি উদ্যোগ ছিল ‘গুরুবার’। মাত্র সাতজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছিল এই আড্ডা। ধীরে ধীরে এটি পরিণত হয় নিয়মিত পাঠচক্রে। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা হতে থাকে সেখানে। প্রায় দেড় বছরে একশর বেশি বৈঠকের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে চিন্তাশীল তরুণদের একটি পরিসর। অংশগ্রহণকারীদের ভাষ্য, সেখান থেকেই ‘আইডিয়াভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি’র ধারণা হয় আরও সুসংগঠিত। এই পাঠচক্রের নেতৃত্বে ছিলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম, সমন্বয়ে ছিলেন আইন বিভাগের মাহফুজ আবদুল্লাহ, যিনি মাহফুজ আলম নামেও পরিচিত।
আসিফ মাহমুদ জানালেন, গবেষণার কাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে বসে ১৯৬৫ থেকে ১৯৯০ সালের সংবাদপত্র ঘেঁটেছেন। কীভাবে অতীতের আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, কীভাবে হরতাল সফল হয়েছে, কীভাবে জনমত তৈরি হয়েছে— চেষ্টা করেছেন এসব বোঝার। পাশাপাশি পড়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তাবিদের বই।
জুলাই আন্দোলনের সংগঠক ও জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান জানালেন, তাদের প্রস্তুতি ছিল তিন স্তরে। রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক। ছাত্রলীগের গেস্টরুম সংস্কৃতি, আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড, বিরোধী মত দমনের অভিজ্ঞতা এবং গুমের শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তারা উপলব্ধি করেন, শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়েও ভাবতে হবে। তাই আন্দোলনের পাশাপাশি তারা একটি নতুন রাষ্ট্রের ধারণা নিয়েও আলোচনা করেছেন।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম আগামীর সময়কে বললেন, তারা বিশ্বাস করতেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। তাই সম্ভাব্য গণআন্দোলনের কৌশল, অংশীজন এবং কেন্দ্র নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ২০২৪ সালের ৫ জুন কোটা পুনর্বহালের রায়ের পর তারা সিদ্ধান্ত নেন, এই আন্দোলনকে শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না; বরং এটিকে রূপ দেওয়া হবে বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে।
ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবও মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পরিণতি। তার ভাষায়, বিরোধী রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের ভিত্তির ওপরই জুলাইয়ের বিস্ফোরণ দাঁড়িয়ে ছিল।
রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আইনুল ইসলাম বললেন, কোনো গণঅভ্যুত্থান কখনোই শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সমাজীকরণ, সাংগঠনিক অনুশীলন এবং নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া।
তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব কোনো একক গোষ্ঠীর নয়; বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন, পেশাজীবী, শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণই এটিকে জাতীয় গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।




