নগর ডোবে, হিসাব ভাসে
- সিলেট নগরে জলাবদ্ধতা : ১৬ বছরে ১১২৭ কোটি টাকা খরচ করেও সুফল মেলেনি

সংগৃহীত ছবি
সিলেট নগরের জলাবদ্ধতা দূর করতে কত কিছুই তো করা হলো। তারপরও একটু বৃষ্টিতেই নগর ডোবে কেন, এ প্রশ্ন নগরবাসীর মনে জাগতেই পারে। গত ১৬ বছরে এ খাতে খরচ করা হয়েছে হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু জলাবদ্ধতার কবল থেকে মুক্তি মেলেনি। টানা বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় নগর। প্রধান সড়কগুলোতে থই থই করে, বাসা-বাড়িতেও ঢুকে পড়ে পানি। ভেসে যায় সবকিছু। নগরের জলাবদ্ধতা নিয়ে এরকম আরও অনেকগুলো ‘কেন’-এর মধ্যেই হয়ত লুকিয়ে আছে প্রতি বছর বৃষ্টিতে জলমগ্ন নগরের অপরিকল্পিত উন্নয়নের আসল গল্প।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে সিলেট নগরকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা করতে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা খরচ করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন। নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ছড়া ও খাল খনন কাজে ব্যয় করা হয়েছে এই বিপুল অর্থ। কিন্তু এখনও এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ডুবে যায় নগর। নগর বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণেই সুফল পাওয়া যায়নি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের ব্যাখ্যা, নগরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টি ও উজানের ঢল ধারণ করতে পারে না সুরমা নদী। তাই ড্রেনের পানি নদীতে যেতে পারে না। এ কারণেই নগরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
নগর সংস্থার এমন ব্যাখ্যা মানতে নারাজ নগরের মানুষ। তাদের মতে, সিলেট সবসময়ই বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল। অতীতের তুলনায় এখন বৃষ্টি নেই বললেই চলে। তবুও কেন ডোবে নগর? নগরের তালতলা এলাকার বাসিন্দা নাজমুল ইসলাম বলছিলেন, ‘আগে টানা দিনভর বৃষ্টি হলেও নগরে পানি উঠেনি। এখন কেন এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে বাসা-বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে?’ তার মতে, অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণেই এমনটি হচ্ছে।
সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) সূত্রে জানা গেছে, নগরের ভেতর দিয়ে ছোট-বড় মিলিয়ে ১১টি ছড়া (খাল) প্রবাহমান। এসব ছড়ার ১৬টি শাখা ছড়াও রয়েছে। ছড়া-খালগুলোর দৈর্ঘ্য প্রায় ১১০ কিলোমিটার। এর বাইরে নালা-নর্দমা আছে ৯৭০ কিলোমিটার। নালা-নর্দমায় পাকা ড্রেন আছে প্রায় সাড়ে ৬০০ কিলোমিটার। এসব ছড়া-খালের শেষ গন্তব্য সুরমা নদী।
নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জলাবদ্ধতার জন্য তারা বেশ কয়েকটি বিষয়কে দায়ী করলেন। তাদের মতে, সুরমা নদীর ভরাট হয়ে যাওয়াই একমাত্র কারণ নয়। এটি মাত্র একটি কারণ। এর বাইরে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কাজ না করা, অনেক স্থানে ড্রেনের নিচ পাকা করে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা, পানি চলাচলের স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই প্রতি বছর নগর জলমগ্ন হয়।
পরিবেশবাদী নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবদুল করিম চৌধুরী কিম বললেন, ‘জলাবদ্ধতা দূর করতে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল সেগুলোতে অনেক ঘাটতি ছিল। প্রথমত, কোনো সমীক্ষা করা হয়নি। তাছাড়া, ছড়াগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি, আবার খনন করা হলেও তা গভীর করা হয়নি। ছড়ার পানি নদীতে যাবে কিন্তু নদীমুখে যদি ছড়ার প্রশস্থতা কম থাকে তাহলে তো পানি যেতে পারবে না। জলাবদ্ধতা হবেই। এ ছাড়া ছড়ার দুই পাশে গার্ডওয়াল নির্মাণ করে ছড়াগুলোর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করা হয়েছে। ফলে ছড়াগুলো পানি ধারণ করতে পারছে না। বৃষ্টি হলেই নগর ডুবছে।’
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জলাবদ্ধতা নিরসনে ছড়া ও খাল খননসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এরমধ্যে বদরউদ্দিন আহমদ কামরান মেয়র থাকাকালে ২০০৯ সালে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে কয়েকটি ছড়া খনন করা হয় এবং ৫ কিলোমিটার এলাকায় রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ করা হয়। পরে আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র থাকাকালে ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২৩৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এর অধীনে ছড়া দখলমুক্ত করে খনন করা হয়। পাশাপাশি ৩৯ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার রিটেনিং ওয়াল, ইউটাইপ ড্রেন ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়। এর বাইরে দুটি ছড়ার কিছু অংশে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে করা হয়েছে বক্স কালভার্ট। ২০২২ সালে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সাগরদীঘির পাড় এলাকার ছড়া খনন ও সংস্কারকাজ শুরু হয় যা এখনও চলছে। সবশেষ, আওয়ামী লীগের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীও এই খাতে ৬১ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করেন।
এ ছাড়া গত ১৬ বছরে নগরের নালা-নর্দমা প্রশস্ত করা ও নির্মাণ কাজে আলাদাভাবে নগর কর্তৃপক্ষ ৮০০ কোটি টাকার কাজ করেছে। এরমধ্যে ৬০০ কোটি টাকার কাজ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালে আর বাকি ২০০ কোটি টাকার কাজ এখনও চলছে।
নগর ঘুরে দেখা গেল, যেসব ছড়া খনন করা হয়েছিল সেগুলোর বেশির ভাগই আবার ভরাট হয়ে গেছে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হলেও আবার ছড়া দখল হয়ে গেছে। গোয়ালী ছড়া, হলদি ছড়ার বিভিন্ন অংশে গজিয়ে উঠেছে চর।
সিলেট নগরকে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কবল থেকে রক্ষা করতে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। গত ২ মে প্রধানমন্ত্রী সিলেট সফরকালে প্রকল্পটির ভিত্তিস্থাপন করেন। প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা।
সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর জানালেন, স্লুইসগেইট নির্মাণ ছাড়াও সুরমা নদীর দুই পাড় উঁচু করা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে সিসিক প্রায় ৭ হাজার টাকার প্রকল্প তৈরি করেছে। প্রথম পর্যায়ে ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার প্রস্তাবনা জমা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেই প্রকল্পেরই ভিত্তিস্থাপন করেছেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৈঠাখালের কাজিরবাজার মাছবাজার ও তোপখানের মধ্যবর্তী স্থানে, হলদিছড়ার চালিবন্দর এলাকায় ও গোয়ালীছড়ার বোরহান উদ্দীন মাজারের পাশে স্লুইস গেট নির্মাণ করা হবে। বর্ষায় সুরমা নদীর পানি ছড়া ও খালগুলোর চেয়ে উচ্চতায় উঠে গেলে স্লুইস গেটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। এতে সুরমার পানি ঢুকে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না। এছাড়া সুরমার দুই পাড় উঁচু করা হবে। যেখানে উঁচু করার মতো জায়গা নেই সেখানে বন্যা প্রতিরোধক দেয়াল নির্মাণ করা হবে। তিনটি পাম্প স্টেশনও স্থাপন করা হবে। যাতে পাম্পের মাধ্যমে নগরের পানি সুরমা নদীতে নিষ্কাশন করা যায়।
আসছে বর্ষাকালেওৈ কি সিলেট নগর ডুববে— এমন প্রশ্নে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমেদ সরাসরি বললেন ‘ডোবারই তো কথা। এর মধ্যে কোনো কাজ হয়নি।’
আগে তো হাজার কোটি টাকার কাজ হয়েছে তাহলে কি সেখানে ঘাটতি ছিল, এমন প্রশ্নে তার মন্তব্য- ‘ঘাটতি তো অবশ্যই ছিল। না হলে কাজ হলো না কেন? এজন্য সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।’
বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া নতুন প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘এটা ভালো উদ্যোগ অবশ্যই। তবে এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন এবং প্রশাসনিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে কাজ শুরুর আগে আবারও সমীক্ষা চালাতে হবে। যাতে প্রকল্পটি কার্যকর হয়।’
প্রকল্পটির বিষয়ে আশাবাদী সিসিক প্রশাসক আবদুল কাইয়ূম চৌধুরীও। তিনি বলছিলেন, ‘সিলেটের উন্নয়নে বিএনপি সরকার আন্তরিক। সিলেট নগরে জলাবদ্ধতা ও বন্যা দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। বর্তমান প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন নগরবাসী নদীর পাড়ে আধুনিক ও নান্দনিক একটি পরিবেশ পাবেন, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’




