ফের ইরানে হামলা
বন্দর আব্বাস, কেশম ও হেঙ্গাম শহরে শোনা গেছে বিস্ফোরণের আওয়াজ

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে নতুন করে একাধিক হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম। একই সময়ে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া গেছে বিস্ফোরণের খবর।
সেন্টকমের দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে চালানো হয়েছে ‘অতিরিক্ত আত্মরক্ষামূলক হামলা’। এসব হামলা ইরানের ‘অযৌক্তিক ও ধারাবাহিক আগ্রাসনের’ জবাবে পরিচালিত হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ জানাচ্ছে, বন্দর আব্বাস শহরে শোনা গেছে বিস্ফোরণের শব্দ। তবে সেই বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ প্রকাশ করা হয়নি। একই সময়ে কেশম ও হেঙ্গাম এলাকায় শোনা বিস্ফোরণের জন্য ‘সামরিক প্রকৃতির ক্ষেপণাস্ত্র’ দায়ী বলে জানিয়েছে বার্তাসংস্থাটি।
এর আগে ইরানকে নতুন হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, চুক্তিতে সই করতে রাজি না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোকে লক্ষ্য করে দিতে পারেন নতুন হামলার নির্দেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘পুরোপুরি বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। তাদের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বড় অংশের কার্যত আর কোনো অস্তিত্বই নেই। ... মধ্যপ্রাচ্যের মোড়লের মৃত্যু ঘটেছে।’ আরেক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ‘ইরান কোনো ব্যবসাই করতে পারছে না, সামরিক বাহিনীর বেতন বা অন্য কোনো বিল পরিশোধ করতে পারছে না তারা। দ্রুত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে তারা।’
এদিকে চলমান উত্তেজনার মধ্যে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি বলেছেন, ‘হুমকি, ভয়ভীতি বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো টেকসই চুক্তি সম্ভব নয়।’
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে বারবার দেওয়া হুমকি, এমনকি সাম্প্রতিক সামরিক হুমকি থেকেও বিরত থাকতে হবে।
তার ভাষ্য, ইরান কখনো হুমকি ও চাপের মধ্যে আলোচনা করেনি এবং ভবিষ্যতেও কোনো ধরনের চাপ বা জবরদস্তির কাছে নতি স্বীকার করবে না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এখনই বুঝতে হবে যে সামরিক হুমকি ও ভয়ভীতি উল্টো ফল বয়ে আনে।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে তিনি বলেন, যদি ওয়াশিংটন সত্যিই কূটনৈতিক সমাধান চায়, তাহলে তাকে হুমকির ভাষা পরিত্যাগ করে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে আলোচনায় ফিরতে হবে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যেকোনো কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য ন্যূনতম একটি স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় লেখেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার পরও আমাদের দৃঢ়তা ও সংকল্পকে পরীক্ষা করার পথ বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যেকোনো হামলা বা হুমকির জবাব দিতে প্রস্তুত আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী। নিরাপদ থাকতে চাইলে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে চলে যান।’
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, মঙ্গলবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলে ইরানের ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। পরে প্রায় দুই ঘণ্টার অভিযানে এর দুই ক্রুকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ উপকূলজুড়ে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, ইরানের প্রায় ২০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
এর জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দাবি, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে তারা। মোট ২১টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে বলে তাদের দাবি। সশস্ত্র বাহিনী আরও জানায়, জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটির চারটি স্থাপনায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং একটি কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রও ছিল।
উত্তেজনা বাড়লেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থেমে নেই। উভয় পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে বুধবার তেহরানে পৌঁছায় কাতারের একটি প্রতিনিধিদল। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে অবশিষ্ট মতপার্থক্য কমিয়ে আনতে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মন্তব্য, ‘পাল্টাপাল্টি হামলা আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করে সামরিক অভিযান। এর ৪০ দিন পর ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই দেশ। পরে ইসলামাবাদে দুই পক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দীর্ঘ বৈঠক হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। এরপর থেকে নতুন বৈঠকের উদ্যোগ চলমান রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি হামলা সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিলেও উভয় পক্ষই এখনো কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি।







