মাছের গবেষণায় নীরব বিপ্লবী

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মাসুদ রানা। ছবি : সাজ্জাদ হোসেন
মৎস্য খাতের উন্নয়নে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মাসুদ রানা একের পর এক আবিষ্কার করে চলেছেন। তার এই জীবনের গল্প শোনাচ্ছেন তাহিরুল হাসান ফাহিম। ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবক
নওগাঁর পত্নীতলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি, ১৯৯০ সালে। ছোটবেলা থেকে মেধাবী ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অসাধারণ মেধার স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক জয় করেন ২০১৪ সালে। ড. মাসুদ রানা এখন সহকারী অধ্যাপক। ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক। কৃষি ও মৎস্য খাতের উন্নয়নের জন্য তিনি প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন করে চলেছেন। তার আবিষ্কারের মধ্যে আছে ‘স্মার্ট ফিশ ফিডার’, ‘স্মার্ট মেরিন কেজ কালচার’, ‘সৌরচালিত স্মার্ট অ্যারেটর’, ‘ওয়াটার কোয়ালিটি মনিটরিং সিস্টেম’, ‘আইওটি নিয়ন্ত্রিত স্মার্ট সোলার ড্রায়ার’ প্রভৃতি। কীভাবে গবেষণায় এলেন— এই প্রশ্নের জবাবে ড. মাসুদ রানা বলেছেন, ‘গবেষণার প্রতি আমার আগ্রহের শুরু শিক্ষাজীবন থেকেই। বাংলাদেশের কৃষি ও মৎস্য খাতের বাস্তব সমস্যাগুলো খুব কাছ থেকে দেখে উপলব্ধি করেছি, দেশের কৃষক ও খামারিরা খাদ্যের অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয়, দক্ষ জনবলের সংকট, অপচয়, রোগব্যাধি, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের মতো নানা ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করছেন। এসব সমস্যার স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে সম্ভব। এর পর থেকে কৃষি ও মৎস্য খাতের জন্য ব্যবহারযোগ্য, স্বল্প খরচের, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনে আত্মনিয়োগ করি।’ তিনি চান, প্রযুিক্তর মাধ্যমে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন আরও সহজ, নিরাপদ, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব হোক। যেসব সাধারণ যন্ত্র ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে স্মার্ট হয়ে ওঠে, মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই তথ্য সংগ্রহ ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট সেন্সর, সৌরশক্তি ও ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনার ব্যবহার হয়— এমন সব আবিষ্কারের দিকে তার খেয়াল। গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে হোপস ফাউন্ডেশন এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড, ২০২২ সালে দেশের সেরা কৃষি উদ্ভাবক হিসেবে এসিআই-দীপ্ত কৃষি অ্যাওয়ার্ড, ২০২৪ সালে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে মৎস্য খাতে বিশেষ অবদানের জন্য জাতীয় মৎস্য পদক এবং ২০২৫ সালে প্রথম আলো-সিটি ব্যাংক সেরা ইনোভেশন ক্যাটাগরিতে রানারআপ সম্মাননা লাভ করেছেন।
স্মার্ট ফিডার
আইওটিভিত্তিক স্মার্ট ফিডার তৈরি করেছেন ড. মাসুদ রানা। এর লক্ষ্য উৎপাদন ব্যয় কমানো ও উৎপাদন বাড়ানো। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, যা নির্ধারিত সময় ও নির্ধারিত পরিমাণে মাছ বা প্রাণিসম্পদের খাদ্য সরবরাহ করতে পারে। প্রচলিত পদ্ধতিতে খামািরদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত থেকে হাতে খাবার দিতে হয়। এতে যেমন শ্রম ও সময় বেশি লাগে, তেমনি অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাদ্য প্রয়োগের কারণে খাবারের অপচয় হয় এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। স্মার্ট ফিডার এই সমস্যার কার্যকর সমাধান দেয়।
এই যন্ত্রে একটি স্মার্ট কন্ট্রোল ইউনিট, সেন্সর, খাদ্য সংরক্ষণের ড্রাম এবং স্বয়ংক্রিয় মোটরচালিত বিতরণ ব্যবস্থা রয়েছে। খামারি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দিনে কয়বার খাদ্য দেওয়া হবে, কখন দেওয়া হবে এবং প্রতিবার কতটুকু খাদ্য সরবরাহ করা হবে— সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারণ করে দিতে পারেন। নির্ধারিত সময়ে যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রাম থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য বের করে পানিতে ছিটিয়ে দেয়। ফলে মাছের প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত হয় এবং অতিরিক্ত খাদ্য পুকুরের তলদেশে জমে পানিদূষণ বা অ্যামোনিয়া তৈরির ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্ট ফিডার সঠিক পরিমাণে খাদ্য সরবরাহের ফলে খাদ্যের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং শ্রম ব্যয়ও হ্রাস পায়। এর ফলে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে মাছের বৃদ্ধি সমানভাবে হয় এবং পানির গুণগত মানও ভালো থাকে। এই স্মার্ট ফিডারের বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
কৌটায় মাছ
দেশে মাছের মূল্য সংযোজন ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ানোর লক্ষ্যে ড. মাসুদ রানা মাছের কৌটাজাতকরণ বা ফিশ ক্যানিং প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। প্রযুক্তিটির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পরিষ্কার, রান্না, জীবাণুমুক্ত এবং বায়ুরোধী ধাতব কৌটায় সংরক্ষণ করা হয়। উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করার কারণে এসব কৌটাজাত মাছ দীর্ঘদিন নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায় এবং রেফ্রিজারেশন ছাড়াই বাজারজাত করা সম্ভব। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলিশ, তেলাপিয়া, কই, টেংরা, মলা, বাইমসহ প্রায় ১০ প্রজাতির মাছ সফলভাবে কৌটাজাত করা হয়েছে।
বাজারে ১৮০ গ্রাম ইলিশ মাছের একটি ক্যানের মূল্য প্রায় ৪০০ টাকা আর ২০০ গ্রাম মলা মাছের একটি ক্যানের দাম প্রায় ২৫০ টাকা। প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে লজি অ্যাগ্রো ১৮ মাস ধরে সফলভাবে কৌটাজাত মাছ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের বাজারের পাশাপাশি কানাডা, যুক্তরাজ্য ও চীনে পণ্য রপ্তানি করছে। এর মাধ্যমে মূল্য সংযোজিত মৎস্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়েছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছের কৌটাজাতকরণের রেসিপি ও প্রটোকল উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের মে মাসে ড. মো. মাসুদ রানা শিল্প মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি লাভ করেন। এই স্বীকৃতি তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তির শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
সৌরশক্তির স্মার্ট অ্যারেটর
মাছ চাষে অক্সিজেনের ঘাটতি একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে রাতের বেলা অতিরিক্ত মাছের ঘনত্ব, গরম আবহাওয়া বা অতিরিক্ত খাদ্য ব্যবহারের কারণে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন দ্রুত কমে যেতে পারে। এর ফলে মাছের মৃত্যু ঘটে এবং খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই সমস্যা সমাধানে ড. মো. মাসুদ রানা উদ্ভাবন করেছেন আইওটি-নিয়ন্ত্রিত সৌরশক্তিচালিত স্মার্ট অ্যারেটর (বাতাস বা অক্সিজেন মেশানোর যন্ত্র) ও ওয়াটার কোয়ালিটি মনিটরিং সিস্টেম। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যা একই সঙ্গে পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রয়োজন হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানিতে অক্সিজেন সরবরাহ করে।
যন্ত্রটিতে অত্যাধুনিক সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে, যা সার্বক্ষণিকভাবে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন, তাপমাত্রা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে। অক্সিজেনের মাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে নেমে এলে অ্যারেটর স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে পানিতে বাতাস মিশিয়ে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। পুরো সিস্টেমটি সৌরশক্তিচালিত হওয়ায় বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যায় এবং বিদ্যুৎ না থাকলেও পকেট রাউটার ও মোবাইল নেটওয়ার্কভিত্তিক সংযোগের মাধ্যমে এটি কাজ করতে পারে। খামারিরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে যেকোনো স্থান থেকে পুকুরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে দূর থেকেই অ্যারেটর চালু বা বন্ধ করতে পারেন। স্মার্ট অ্যারেটরের মূল্য প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা।







