একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র
- দ্বিতীয় অধ্যায়: প্রাণীর পরিচিতি

ফাইল ছবি
(পূর্ব প্রকাশের পর)
সৃজনশীল প্রশ্ন-১
সোহান তার বাগানে পরিচ্ছন্নতা কাজ করার সময় হঠাৎ একটি ফড়িংকে এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে পড়তে দেখল। কৌতূহলবশত বিষয়টি নিয়ে সে তার শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করলে শিক্ষক বললেন, ‘এই পতঙ্গটির রেচন ও শ্বসন প্রক্রিয়া সাধারণ প্রাণীদের চেয়ে আলাদা। এদের প্রধান রেচন অঙ্গ থেকে বর্জ্য সরাসরি পৌষ্টিকনালিতে চলে যায় এবং অপাচ্য খাদ্যের সঙ্গে দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। এ ছাড়া এদের রক্তে কোনো শ্বাসরঞ্জক না থাকায় রক্ত অক্সিজেন পরিবহনে অংশ নেয় না; বরং বায়ুনালির তৈরি একটি বিশেষ তন্ত্রের মাধ্যমে বাতাস সরাসরি কোষের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
ক. ওমাটিডিয়াম কী?
খ. ট্রাকিয়ালতন্ত্র বলতে কী বোঝায়?
গ. উদ্দীপকে বর্ণিত প্রাণীটির রেচন বর্জ্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘উক্ত প্রাণীটির দেহে অক্সিজেন পরিবহনে রক্তের কোনো ভূমিকা নেই’— উদ্দীপকের আলোকে উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
(ক) ঘাসফড়িংয়ের মতো পুঞ্জাক্ষিযুক্ত প্রাণীদের দর্শনের গঠনগত ও কার্যকরী একককে ওমাটিডিয়াম (Ommatidium) বলে।
(খ) ঘাসফড়িং বা পতঙ্গশ্রেণির প্রাণীদের দেহে গ্যাসীয় বিনিময় (অক্সিজেন গ্রহণ ও কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগ) সম্পাদনের জন্য গঠিত বিশেষ বায়ুনালিতন্ত্রকে ট্রাকিয়ালতন্ত্র (Tracheal System) বলে। এটি মূলত শ্বাসনালি বা ট্রাকিয়া, শ্বাসরন্ধ্র (স্পাইরাকল), বায়ুথলি এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম ট্রাকিওল নালি দিয়ে গঠিত। এ তন্ত্রের সাহায্যে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন সরাসরি রক্তে না গিয়ে দেহের প্রতিটি কোষে পৌঁছে যায়।
(গ) উদ্দীপকে বর্ণিত প্রাণীটি হলো ঘাসফড়িং। এর প্রধান রেচন অঙ্গ হলো মালপিজিয়ান নালিকা (Malpighian tubules)। নিচে এর রেচন বর্জ্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করা হলো:
· বর্জ্য শোষণ: মালপিজিয়ান নালিকাগুলোর বন্ধ বা মুক্ত প্রান্ত হিমোসিলে (দেহের রক্তপূর্ণ গহ্বর) ভাসমান থাকে। রক্ত থেকে নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য পদার্থ, পানি ও লবণ শোষিত হয়ে নালিকার ভেতরে প্রবেশ করে।
· ইউরিক অ্যাসিডে রূপান্তর: নালিকার ভেতরে রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে দ্রবণীয় পটাশিয়াম ইউরেট বর্জ্য কঠিন ইউরিক অ্যাসিড ক্রিস্টালে পরিণত হয়।
· পৌষ্টিকনালিতে স্থানান্তর ও পুনঃশোষণ: এই ইউরিক অ্যাসিড নালিকার মাধ্যমে সরাসরি ঘাসফড়িংয়ের পশ্চাদান্ত্রে (মলনালিতে) পৌঁছায়। এখানে প্রয়োজনীয় পানি ও লবণ পৌষ্টিকনালি কর্তৃক পুনঃশোষিত হয়ে রক্তে ফিরে যায়।
· নিষ্কাশন: পরিশেষে অদ্রবণীয় ও কঠিন ইউরিক অ্যাসিড ক্রিস্টালগুলো পৌষ্টিকনালির অপাচ্য খাদ্যবর্জ্য বা মলের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে পায়ুছিদ্র দিয়ে দেহের বাইরে নিষ্কাশিত হয়।
(ঘ) উদ্দীপকের উক্তিটিতে বলা হয়েছে— ‘উক্ত প্রাণীটির দেহে অক্সিজেন পরিবহনে রক্তের কোনো ভূমিকা নেই’— উক্তিটি ঘাসফড়িংয়ের শারীরবৃত্তীয় গঠনের নিরিখে সম্পূর্ণ যথার্থ। নিচে এর সপক্ষে বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রদান করা হলো:
· রক্তের উপাদানের ভিন্নতা (হিমোলিম্ফের ভূমিকা): মানবদেহের রক্তে ‘হিমোগ্লোবিন’ নামক শ্বাসরঞ্জক থাকে, যা অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাসায়নিকভাবে অক্সি-হিমোগ্লোবিন হিসেবে দেহের কোষে কোষে অক্সিজেন পরিবহন করে। কিন্তু ঘাসফড়িংয়ের রক্তকে বলা হয় হিমোলিম্ফ (Haemolymph)। এই হিমোলিম্ফে কোনো প্রকার শ্বাসরঞ্জক (যেমন: হিমোগ্লোবিন বা হিমোসায়ানিন) থাকে না। রক্তরসে কোনো শ্বাসরঞ্জক না থাকায় ঘাসফড়িংয়ের রক্ত গ্যাসীয় পরিবহন (অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড) সম্পাদন করতে অক্ষমে পরিণত হয়। এর রক্তের মূল কাজ কেবল খাদ্যসার, হরমোন ও বর্জ্য পদার্থ পরিবহন করা।
· বিশেষায়িত ট্রাকিয়ালতন্ত্রের উপস্থিতি: রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন পরিবহন অসম্ভব হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবেই ঘাসফড়িংয়ের দেহে একটি বিশেষ ও স্বাবলম্বী ট্রাকিয়ালতন্ত্র (Tracheal System) গঠিত হয়েছে। এই তন্ত্রটি সরাসরি বায়ুমণ্ডল থেকে বাতাস গ্রহণ করে এবং রক্ত সংবহনতন্ত্রকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে দেহের প্রতিটি জীবিত কোষে সরাসরি অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।
· সরাসরি কোষ-স্তরে গ্যাসীয় বিনিময়ের কৌশল: ঘাসফড়িংয়ের দেহে গ্যাসীয় পরিবহনের পর্যায়গুলো নিম্নরূপ:
শ্বাসরন্ধ্র বা স্পাইরাকল (Spiracle): ঘাসফড়িংয়ের দেহের দুপাশে মোট ১০ জোড়া (২ জোড়া বক্ষীয় ও ৮ জোড়া উদরীয়) শ্বাসরন্ধ্র থাকে, যা দিয়ে বায়ুমণ্ডলের বাতাস ভেতরে প্রবেশ করে।
ট্রাকিয়া ও বায়ুথলি: স্পাইরাকল থেকে বাতাস মূল শ্বাসনালি বা ট্রাকিয়া এবং ট্রাকিয়ার তৈরি বায়ুথলিতে (Air sac) সংগৃহীত হয়।
ট্রাকিওল (Tracheole): ট্রাকিয়া বহুধাবিভক্ত হয়ে ১ মাইক্রোমিটারের চেয়েও কম ব্যাসযুক্ত সূক্ষ্ম নালি, অর্থাৎ ট্রাকিওল গঠন করে। ট্রাকিওলের শেষ প্রান্তটি কোষীয় তরল বা রসে পূর্ণ থাকে এবং এটি প্রতিটি কোষের প্লাজমা মেমব্রেনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে।
প্রসারণ ও ব্যাপন প্রক্রিয়া: ট্রাকিওলের শেষ প্রান্তে থাকা রসে বাতাসে থাকা অক্সিজেন সহজে দ্রবীভূত হয়। এরপর ব্যাপন (Diffusion) প্রক্রিয়ায় রক্তে মিশে যাওয়া ছাড়াই অক্সিজেন সরাসরি নালি থেকে কোষের ভেতরে প্রবেশ করে। একইভাবে কোষের শ্বসন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন কার্বন ডাইঅক্সাইড একই পথে বিপরীতমুখী হয়ে দেহ থেকে বেরিয়ে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, ঘাসফড়িংয়ের শ্বসন কৌশলটি এমনভাবে নকশা করা, যেখানে বায়ুনালির প্রান্তভাগ সরাসরি কোষের দরজায় গিয়ে শেষ হয়েছে। রক্তে শ্বাসরঞ্জক না থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত সুগঠিত ট্রাকিয়ালতন্ত্রের বদৌলতে অক্সিজেন পরিবহনে রক্তের কোনো প্রয়োজনীয়তা বা ভূমিকা তৈরি হয় না। তাই উদ্দীপকের বক্তব্যটি বিজ্ঞানসম্মতভাবে শতভাগ সঠিক।
(বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)




