রুয়েটের অগ্রদূত

ছবি: আগামীর সময়
“ছোটবেলায় খেলনা গাড়ি, বাসার দেয়ালের ঘড়িটি কীভাবে চলে দেখার খুব আগ্রহ হতো। কিন্তু বাবার বকুনির ভয়ে সেগুলো আর খুলে দেখা হতো না। বড় হয়ে ভর্তি হলাম রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট)। তখন মাথায় খেলে গেল, গাড়ি বা রোবট নিজেদেরই বানাতে হবে। ফলে যোগ দিলাম ‘অগ্রদূত’-এ।” নিজের গল্প করছিলেন আরিফুল ইসলাম রিয়াদ। তিনি এখন এই প্রকল্পের দলনেতা। যুগ্ম দলনেতা সালিম সাদমান বললেন, ‘আমাদের তৈরি এই মার্স রোভার বা মঙ্গল গ্রহে চলাচল ও গবেষণা করার জন্য তৈরি দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটিক মোটরযান অনেক কিছু পারে। দুই থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত লাইভ ভিিডও স্ট্রিমিং করতে পারে। এর রকার-বগি সাসপেনশন প্রযুক্তির জন্য এটি চাঁদ বা মঙ্গলের মতো দুর্গম ও প্রতিকূল ভূখণ্ডে ভারসাম্য বজায় রেখে চলাচল করতে পারে। নির্দিষ্ট বস্তু শনাক্ত করে পেছন পেছন যেতে পারে। সেটি সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে পারে। রোবটিক আর্ম বা হাতের মাধ্যমে মানুষের মতো সূক্ষ্ম কাজ, যেমন— যেকোনো সুইচ অন-অফ করতে পারে, পেনড্রাইভ যুক্ত করতে পারে। এ ছাড়া রোভারটি পথ বিশ্লেষণ করে নিরাপদে চলাচল করতে পারে। বৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহ করতে পারে। তথ্য বিশ্লেষণ করে বেজ স্টেশনে পাঠাতে পারে।’
এ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ জোগাড় করতে নানা ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছে অগ্রদূত-এর কর্মীদের। ফলে চাকা, রকার বগি সাসপেনশন, রোবটিক আর্ম ও সায়েন্স মডিউলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশ রুয়েটের এই উদ্ভাবক দল সীিমত সুযোগ-সুবিধায় তৈরি করেছে।
আমাদের এই সফল রোভার তৈরির পথটি কখনোই সহজ ছিল না। প্রতিনিয়ত ল্যাব সুবিধার সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের অভাব মোকাবিলা করতে হয়েছে
অগ্রদূত যাত্রার পরের বছরই ইন্ডিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জে এশিয়ার সেরা ছয়টি মার্স রোভারের মধ্যে উঠে আসে। ২০১৯ সালে পোল্যান্ডে হয়েছিল ইউরোপিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ। সেখানে সারা বিশ্ব থেকে আসা রোভারগুলোর মধ্যে ২৭তম স্থান দখল করে। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক রোভার ডিজাইন চ্যালেঞ্জে তাদের অগ্রদূতের ডিজাইন সারা বিশ্বের মধ্যে ১১তম স্থান দখল করে। বাংলাদেশে হয় সবার সেরা। ২০২৫ সালে আইআরডিসির (ইন্টারন্যাশনাল রোভার ডিজাইন চ্যালেঞ্জ) সেমিফাইনালে ওঠে অগ্রদূত। সে বছরের আইআরসিতে (ইন্টারন্যাশনাল রোভার চ্যালেঞ্জ) হয় ফাইনালিস্ট। ২০২৬ সালে এআরসিতে (অ্যানাটোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ) সারা বিশ্বে ১৩তম ও বাংলাদেশে প্রথম হয় অগ্রদূত।
তবে এই সাফল্যের যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। অগ্রদূত টিম ম্যানেজার এস এম আল মিরাজ বলেছেন, ‘আমাদের এই সফল রোভার তৈরির পথটি কখনোই সহজ ছিল না। প্রতিনিয়ত ল্যাব সুবিধার সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের অভাব মোকাবিলা করতে হয়েছে। রাজশাহীতে থাকায় আমাদের যন্ত্রপাতি জোগাড় করতেও বেগ পেতে হয়েছে। কখনো একটি ছোট যন্ত্রাংশের অভাবে পুরো কাজই আটকে গেছে। ফান্ডে টাকা না থাকায় অগ্রদূতের সদস্যদের পকেটের টাকায় কাজ করতে হয়েছে। আমাদের নিজস্ব কোনো রুম না থাকায় কাজের জায়গার অভাব মোকাবিলা করতে হয়েছে। দামি যন্ত্রাংশগুলো নিরাপদে রাখতে পারিনি।’ তিনি জানালেন, পরে রুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন টাকা দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছে।
অগ্রদূতে কাজ করছে মোট ছয়টি দল। সেগুলো হলো—ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, সফটওয়্যার, কমিউনিকেশন, সায়েন্স ও বিজনেস। দলগুলোতে আছেন মোট ৫০ জন ছাত্রছাত্রী। তাদের এই কাজে শিক্ষকদের উৎসাহ আছে। তারা ছাত্রছাত্রীদের হাতে-কলমে সফটওয়্যার বানানো শিখিয়েছেন। নতুন প্রজন্মকে গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করা অগ্রদূতের অন্যতম লক্ষ্য। সে জন্য তাদের নিয়ে নিয়মিত সেশন করানো হয়, ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার কীভাবে ব্যবহার করবেন, সেসব শেখানো হয়। এর মাধ্যমে অগ্রদূত ছড়িয়ে পড়ছে আগামী প্রজন্মের মধ্যে।




