আনচেলত্তির ‘জুয়া’য় কি ডুবল ব্রাজিল

ব্রাজিলের পাঁচ ম্যাচের কেবল দুটি খেলেছেন নেইমার, তাও বদলি হয়ে। ছবি: রয়টার্স
ব্রাজিল টানা তিন বছর কার্লো আনচেলত্তির পেছনে এমনভাবে ছুটেছিল, যেন এই ইতালিয়ানের কাছে হেক্সা জয়ের সোনার চাবি আছে। বাস্তবতা হচ্ছে শুধু ঐতিহ্য আর প্রত্যাশায় বুঁদ হয়ে থাকা একটি দল নিয়ে অলৌকিক কিছু করা যায় না। পারেননি আনচেলত্তিও।
রিয়াল মাদ্রিদে থাকা আনচেলত্তিকে পেতে অপেক্ষা করে গেছে ব্রাজিল। এই সময় তারা দায়িত্ব দিয়েছে তিনজন অন্তর্বর্তী কোচকে। তারা দলটাকে দিগভ্রান্ত করে রেখে গিয়েছিলেন। আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই চোরাবালি থেকে দলকে টেনে তুলতে পারেননি। আসলে তিন বছরের বিশৃঙ্খলা মেরামত করতে একটি বছর যথেষ্ট নয় কোনোভাবে।
আনচেলত্তি ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ হতে পারেন, তবে এই বিশ্বকাপ দেখাল তিনিও একজন মানুষ মাত্র। বরং তার কিছু বড় সিদ্ধান্তই দলের কাল হয়েছে। যেমন দলে কাসেমিরো, দানিলো আর নেইমারকে রাখা। তাদের সবারই নামের ভার যেমন ছিল, তেমনি ছিল বয়সের ক্লান্তিও। নরওয়ের বিপক্ষে সেটিই ফুটে উঠেছে।
নরওয়ের দুটি গোলই হয়েছে বাম প্রান্ত দিয়ে, যেখানে আন্দ্রেয়াস শিয়েলদেরুপ গতিতে খেই হারায় ব্রাজিল। ৩৪ বছর বয়সী দানিলো ছিলেন রাইটব্যাকে, অথচ টানা তিন বছর এই পজিশনে নিয়মিত খেলেননি তিনি। তাই শিয়েলদেরুপ যখনই বল নিয়ে তেড়ে আসছিলেন, দানিলোকে একদম অসহায় লাগছিল।
কাসেমিরোও প্রতিপক্ষের গতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি, একের পর এক ভুল পাস দিয়েছেন। নিউ জার্সির গরমে তাকে মনে হচ্ছিল পিরেনিজ পর্বতমালার কোনো সরু পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে টেনেটুনে ওপরে ওঠা পুরনো লরির মতো। এরপর এলেন নেইমার। তার সেই চেনা বিধ্বংসী ড্রিবলিংয়ের গতি ছিল উধাও। ধীরগতির, ছন্নছাড়া নেইমারকে করুণ দেখাচ্ছিল। সব মিলিয়েই ২০০২ বিশ্বকাপের পর টানা ২৪ বছর ট্রফিহীন রইল ব্রাজিল।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬ থেকে বিদায় নেওয়ায়, শুধু ২০৩০ সালেই বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব ব্রাজিলের। তাই ২৪ বছরের খরা বেড়ে হবে ২৮ বছরে। ইতিহাসে এই প্রথম ব্রাজিলের কোনো জাতীয় দল ট্রফি না জিতে টানা ছয়টি বিশ্বকাপ কাটাবে। ১৯৫৮ সালে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জেতার আগে তারা খেলেছিল পাঁচটি বিশ্বকাপ।
ব্রাজিল আসলে বছরের পর বছর ভবিষ্যতের প্রস্তুতি আর অতীত রোমন্থন করার টানাপড়েনে বাস করছে। প্রতিবার বিদায়ের পর তারা নতুন শুরুর ঘোষণা দেয়। আধুনিকতা, কাঠামো, পদ্ধতি, সাহস ও নিজস্ব পরিচয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু প্রতিটি চক্রেই কোনো না কোনোভাবে সেই পুরনো ভুল আর আত্মতুষ্টিতে ফিরে যায়। ভবিষ্যৎ এখানে আসে একটি ‘প্রজেক্ট’ হিসেবে, আর অতীত ফিরে আসে ‘অভ্যাস’ হয়ে।
ব্রাজিল এখনো প্রতিটি ব্যর্থতাকে মনে করে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা। অথচ ২০০৬ সালের পর দরকার ছিল দল পুনর্গঠনের। ২০১০ সালের পর লক্ষ্য ছিল সেই পুরনো ছন্দ বা জাদু ফিরিয়ে আনা। ২০১৪ সালের অতল গহ্বরে পতনের পর লক্ষ্য ছিল নতুন করে সবকিছু গড়া। ২০১৮ সালে লক্ষ্য ছিল ভালো পারফরম্যান্সকে বাস্তবে পরিণত করা। আর ২০২২ সালে সবকিছুকে আবার গুছিয়ে নেওয়া। ২০২৬ সালে এসে এই বুলিগুলো বড্ড একঘেয়ে। ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার বাস্তব প্রতিফলন নেই কোনো।
আশার কথা হলো, ব্রাজিলে নতুন প্রজন্ম ডানা মেলতে শুরু করেছে। কার্লোস মিগুয়েল, ওয়েসলি, ভিতোর রেইস, মুরিল্লো, কাইকি ব্রুনো, ব্রেনো বিদন, ব্রুনো গিমারেস, এস্তেভাও, রায়ান, এনদ্রিক আর ভিনিসিয়ুস জুনিয়ররা আশার প্রদীপ হয়ে ফিরে আসতে পারেন ২০৩০ বিশ্বকাপে। অন্যান্য চক্রের মতো ব্রাজিলকে এবার একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। ২০৩০ বিশ্বকাপে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের বয়স হবে ২৯ বছর।
পাশাপাশি এনদ্রিক, এস্তেভাও, রায়ানরা এমন একটি ত্রয়ী গঠন করবেন— যাদের বয়স টুর্নামেন্ট শুরুর সময়ে হবে ২৩ বছরের মতো। এ প্রজন্মটিকেই সিবিএফ পরের বিশ্বকাপের মূল কাণ্ডারি হিসেবে দেখছে। ২০৩০ সালে তারা ব্রাজিলকে স্বপ্নের হেক্সা এনে দিতে পারবেন কি না আর নতুন এই প্রজেক্টে আনচেলত্তি থাকবেন কি না, সেটাই দেখার।




