কেমন হবে মেসি পরবর্তী আর্জেন্টিনা

সংগৃহীত ছবি
লিওনেল মেসি। এই নামটি এখন আর্জেন্টিনার ফুটবলের পরিচয়, আবেগ ও ভালোবাসার প্রতীক। তার ফুটবল প্রতিভা এতটাই বিস্ময়কর যে সরাসরি তার তুলনা ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী বা এলিয়েনের সঙ্গে করা হয়। বিগত ২১ বছর তার বাঁ পায়ের জাদুতে আগলে রেখেছেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে। জিতিয়েছেন অসংখ্য শিরোপা। কিন্তু সব অধ্যায়েরই সমাপ্তি থাকে। আর্জেন্টিনায় মেসির রোমাঞ্চকর অধ্যায়েরও বিদায় ঘণ্টা বাজতে চলেছে। ১ অক্টোবর বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে শেষ বারের মতো আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে জড়াবেন এই ৩৯ বছর বয়সী। কিন্তু এরই মধ্যে একটি প্রশ্ন অনেকের মনে উঁকি দিচ্ছে–– কে নেবেন মেসি পরবর্তী আর্জেন্টিনার দায়িত্ব।
নব্বই দশকের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনা শেষবারের মতো যখন তার বুট জোড়া তুলে রেখেছিলেন তখনও একই প্রশ্ন উঠেছিলো। ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া ফাঁকা স্থান কে পূরণ করবে? গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, আরিয়েল ওর্তেগা, হুয়ান রোমান রিকেলমে ও পাবলো আইমারদের মতো তারকারা প্রতিভার জানান দিলেও ম্যারাডোনার মতো দীর্ঘমেয়াদি কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া রাজ্যের যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠেন মেসি।
দীর্ঘ কয়েক দশক পর আবারও একই চ্যালেঞ্জের মুখে আলবিসেলেস্তেরা। তাদের ফুটবল ইতিহাসের সফলতম কাণ্ডারি বিদায়ের পথে। একই প্রশ্ন ও উদ্বেগ আবার সামনে আসছে। কোচ লিওনেল স্কালোনি কি খুঁজে পেয়েছেন মেসির রেখে যাওয়া রাজ্যের যোগ্য উত্তরসূরি? নাকি ম্যারাডোনা পরবর্তী সময়ের মতো বেশ দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর কাটাতে হবে তিনবারের বিশ্বজয়ীদের।
মেসির জায়গা কে নেবেন বা আদোও কেউ নিতে পারবে কিনা সেই প্রশ্নের জবাব সময়ই বলে দেবে। কিন্তু স্কালোনির হাতে এমন কিছু অস্ত্র আছে যারা মেসির অভাব পুরোটা না হলেও অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করার সক্ষমতা রাখেন। এমন কিছু নাম হলো: লাউতারো মার্তিনেস, হুলিয়ান আলভারেস, এনসো ফের্নান্দেস ও নিকো পাজ। তারা সবাই ক্লাব ও জাতীয় দলে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। কিন্তু মেসির পরম্পরাটা ঠিক বয়ে নিতে পারবেন কিনা বলা মুশকিল।
বাস্তবতা হলো মেসির জায়গা পূরণ করা যে কারো জন্যই অসাধ্য সাধন করার মতো। গোল করা, গোল করানো, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ ও খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া –– জাদুকর এতদিন এইসব করেছেন। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের কেউ কেউ গোল করায় পারদর্শী। কেউ গোল করানোয়। অনেকে আবার ম্যাচের গতিও নিয়ন্ত্রণ করেন ভালো। ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ারও সক্ষমতা রাখেন। কিন্তু মেসির মতো একাই সব দায়িত্ব পালন করার সক্ষমতা এককভাবে কারো নেই। মেসির এই বহুমুখী কার্যকারিতা নিয়ে কোচ পেপ গার্দিওলা বলেছিলেন, ‘মেসিই সেরা ৯, সেরা ১০, সেরা ১১, সেরা ৭, সেরা ৬, সেরা ৫, সেরা ৪—সব পজিশনেই মেসিই সেরা।‘
মেসি যে পজিশনে খেলেন সেই ডান প্রান্ত নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথাবার্তা হচ্ছে। এই পজিশনে আলোচনা উঠছে কোমোর তরুণ তারকা নিকো পাজকে নিয়ে। লাউতারো ও আলভারেস মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলেন। এনসো মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী। পাজ মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হলেও ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে এসে খেলার সক্ষমতা রয়েছে। বাঁ পায়ের এই তরুণ মেসির মতোই ডান দিক থেকে আক্রমণ তৈরি করতে পারেন। সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি নিজেও গোল করে প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। তার ড্রিবলিং, পাসিং, ভিশন ও আক্রমণ তৈরির দক্ষতার কারণে মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার আক্রমণে তাকে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাজের মানসিকতাও ইস্পাত কঠিন। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে হারার পর তিনি সরাসরি ঘোষণা দেন, ‘আমি কথা দিচ্ছি আর্জেন্টিনায় এই কাপ ফিরিয়ে আনতে আমি আমার সবটুকু দেব।‘ ক্লাব পর্যায়েও প্রতিনিয়ত নিজের প্রতিভার জানান দিচ্ছেন এই ২২ বছর বয়সী।
দলের নেতৃত্বের জায়গাতেও বড় একটা শূন্যতা তৈরি হবে। তবে এরই মধ্যে স্কালোনি জানিয়ে দিয়েছেন মেসির পর অধিনায়কের আর্ম ব্যান্ড পরবেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। দলে আরও যোগ্য নেতৃত্ব থাকার পরও রোমেরোর উপর আস্থা রাখছেন কোচ। রক্ষণভাগ থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মাঠে তার আগ্রাসী মানসিকতা ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছেন স্কালোনি। এরই মধ্যে মেসি ও নিকোলাস ওতামেন্দির পর তৃতীয় অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রোমেরো। ২০২৫ সালে চিলি, ভেনেজুয়েলা ও বিশ্বকাপের আগে মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে তিন ম্যাচে আর্মব্যান্ডও পরেছেন তিনি। ক্লাব পর্যায়েও অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতা আছে তার।
স্কালোনির উপর রয়েছে পাহাড়সম দায়িত্ব। মেসি পরবর্তী যুগে আর্জেন্টিনাকে প্রস্তুত করা জন্য তার উপরই ভরসা রাখছে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন। তিনি যেভাবে ২০১৮ সালে দায়িত্ব নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করেছিলেন, এবারো তার উপর একই প্রত্যাশা থাকবে সমর্থকদের। তবে সেটা নিশ্চয়ই গতবারের তুলনায় বেশ কঠিন হবে। এছাড়া আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে তিনি কতদিন দায়িত্ব পালন করবেন তাও নিশ্চিত নয়।
‘এ দুনিয়া একবার পায়, তারে পায় নাকো আর’ —এই পঙক্তিটি মেসির ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য। আর্জেন্টিনা কেন পুরো বিশ্বেই তার মতো আরেকজন খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাই আর্জেন্টিনা ও স্কালোনির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ কিভাবে দলীয় পারফরম্যান্স দিয়ে মেসির অভাব পূরণ করা যায় সেই পরিকল্পনা করা। হুবুহু মেসির উত্তরসূরি খোঁজার বিষয়টি আপাতত অনেকটা স্বপ্নের মতোই।



