আনচেলত্তির ফাঁদে ফেলার কৌশল

কার্লো আনচেলত্তি। ছবি: রয়টার্স
১৯৭০ সালের আজতেকা স্টেডিয়ামের ঝাপসা রঙিন ফুটেজে দেখা কিংবা ‘জোগো বনিতো’ ধারণ করা ব্রাজিল এটা নয়। নব্বই দশকের শেষভাগ ও চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকের সেই দলের সঙ্গেও এই ব্রাজিলের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তাহলে এই ব্রাজিল আসলে কোন ব্রাজিল? এবারের বিশ্বকাপে কার্লো আনচেলত্তি যতটা নেইমারের ফিটনেস নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন, তার চেয়ে কোনো অংশে কম পড়েননি ব্রাজিলের ফুটবল-দর্শনবিষয়ক প্রশ্নে। কী হতে যাচ্ছে তার ব্রাজিলের দর্শন?
বিশ্বকাপ শুরুর আগে আনচেলত্তি ব্রাজিলের পরিচয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন দেশটির সবচেয়ে বিখ্যাত সাংস্কৃতিক উৎসব রিও ডি জেনিইরোর কার্নিভালের। তার ভাষায়, ‘আপনি ব্রাজিলকে খুঁজে পাবেন কার্নিভালের মধ্যে। সবার আগে সেখানে আছে সীমাহীন আনন্দ, অফুরন্ত প্রাণশক্তি ও একসঙ্গে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। রিওর কার্নিভাল আসলে অসাধারণ সংগঠনেরও এক নিখুঁত উদাহরণ। ফুটবলে এটাই ব্রাজিল।’ এরপর তিনি যোগ করেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ— বিনয়।
প্রশ্ন হলো, তাতে হেক্সা আসবে তো? আনচেলত্তির কাছে উত্তরটা সহজ— শেষ পর্যন্ত জয়ই আসল। জোগো বনিতো ইতালীয় ট্যাকটিশিয়ানের কাছে খুব একটা অর্থ রাখে না। যারা এখনো সাম্বার ছন্দে নাচা, সৌন্দর্যে মোহিত করা সেই কল্পনার ব্রাজিলকে খোঁজেন, তাদের কাছে আনচেলত্তির দর্শন পছন্দ হওয়ার কথা নয়। বরং তাদের প্রশ্ন আগেরটাই— জয় আসছে কিন্তু সেই জয়ে কি ব্রাজিলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে?
বিশ্বকাপ মঞ্চে একটু একটু করে ফুটে উঠছে আনচেলত্তির ব্রাজিলের চেহারা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে গোল করে তুলে ধরেছেন নিজের সেরাটা। ফিলাডেলফিয়ায় হাইতি এবং মায়ামিতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিল টানা দুটি ক্লিন শিটও রেখেছে। এই দুটি ম্যাচে কি ব্রাজিলের গোলগুলো খেয়াল করেছেন? আশ্চর্যজনকভাবে, সবকটি যেন একই ছাঁচে গড়া।
আনচেলত্তি ম্যাচ শেষে বলেছেন, ‘এই ম্যাচে আমাদের বেশ কয়েকটি গোল এসেছে ট্যাকল করে বল পুনরুদ্ধার করার পর।’ অবশ্য এই ব্রাজিলকে দেখে জার্মানির কোনো গেগেনপ্রেসিং দলের কথা মনে হবে না। তারা প্রতিপক্ষকে শুরু থেকেই দম বন্ধ করে দেওয়া চাপের মধ্যে ফেলে না। বরং আনচেলত্তি যে ‘বিনয়’-এর কথা বলেন, সেটি ফুটে ওঠে অন্যভাবে। ব্রাজিল অনেক সময় ইচ্ছা করেই প্রতিপক্ষকে বলের দখল ছেড়ে দিচ্ছে, খেলার নিয়ন্ত্রণ তুলে দিচ্ছে তাদের হাতে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে হার্ড রক স্টেডিয়ামে স্কটিশরা ৪০০’রও বেশি পাস সম্পন্ন করেছিল। সেটিই ছিল ব্রাজিলের পরিকল্পনার অংশ। তারা অপেক্ষা করে। মুহূর্ত বেছে নেয়। তারপর নিঃশব্দে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে।
স্কটল্যান্ড ম্যাচে প্রথম গোলের আগে রায়ানের চাপে স্কট ম্যাককেনার বল হারানো কিংবা বাতিল হওয়া ভিনিসিয়ুসের দ্বিতীয় গোলের আগে জ্যাক হেন্ড্রির কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে অনেকে সেন্টার-ব্যাকদের ভুল হিসেবে দেখছেন। কিন্তু আনচেলত্তির ব্রাজিলের চোখে এগুলো নিছক ভুল নয়, এসব ছিল পরিকল্পিত ফাঁদ।
বিশ্বকাপের আগে পানামা ও মিসরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দুটোতেই আছে ব্রাজিলের সুযোগসন্ধানী ফুটবল। প্রতিপক্ষের পায়েই বল রাখতে দিচ্ছে বেশি, ভুলের জন্য অপেক্ষা করছে, সময় নিচ্ছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘায়েল করছে। হাইতির বিপক্ষে তিন গোলের মধ্যে দুটি এসেছে প্রতিপক্ষের ভাবনা আগেভাগে পড়ে ফেলার দক্ষতা থেকে।
এই দলের প্লে-মেকার কোনো ব্যক্তি নয়। হয়তো এই ব্রাজিলের সবচেয়ে সৃজনশীল খেলোয়াড় তাদের প্রেসিং। হাইতি ও স্কটল্যান্ড ম্যাচে এই কৌশল দারুণভাবে কাজ করেছে। যদিও মরক্কোর বিপক্ষে খুব একটা সফল হয়নি। তবে এসব তর্ক-বিতর্ক ছাপিয়ে আনচেলত্তির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ৭ পয়েন্ট। মিডিয়ার প্রশংসা কিংবা সৌন্দর্যের চেয়ে সেটির মূল্য অনেক বেশি। কারণ আনচেলত্তির দর্শন পরিষ্কার— সুন্দর ফুটবল নয়, জয়ের জন্য খেলো!




