কার্ডিওলজিস্টের সাক্ষ্য
ম্যারাডোনার জরুরি ওষুধ বন্ধ করেছিলেন চিকিৎসকেরা!

আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার শুনানিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। আদালতে কার্ডিওলজিস্ট গুস্তাভো দি নিরো জানিয়েছেন, ম্যারাডোনার মৃত্যুর আগে তাঁর হৃদরোগের স্পষ্ট সতর্কসংকেত ও বিভিন্ন ডেটা চিকিৎসকরা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন। এমনকি চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর হৃদরোগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল!
২০২১ সালে ম্যারাডোনার মৃত্যুর পেছনের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত আন্তঃবিভাগীয় মেডিকেল বোর্ডের অন্যতম বিশেষজ্ঞ ও কার্ডিওলজিস্ট গুস্তাভো দি নিরো গত বৃহস্পতিবার আদালতে সাক্ষ্য দেন। তিনি জানান, মৃত্যুর আগের শেষ দুই সপ্তাহে ম্যারাডোনার শরীরে যে লক্ষণগুলো দেখা দিয়েছিল, তা স্পষ্টভাবে হার্ট ফেইলিওরের দিকে ইঙ্গিত করে। আদালতে নিরো বলেন, ‘শরীরে তরল জমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট এবং মানসিক অবস্থার পরিবর্তন- এসবকিছুই হৃদরোগের লক্ষণ। নার্সদের রেকর্ডে ম্যারাডোনার উচ্চ রক্তচাপ ও ট্যাকিকার্ডিয়া (হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া) কথা উল্লেখ ছিল। সেই সূত্র ধরে নিরো জানান, এমন উপসর্গ নিয়ে কোনো রোগী তার চেম্বারে এলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ প্রেসক্রাইব করতেন। কিন্তু ম্যারাডোনার ক্ষেত্রে তার চিকিৎসকরা রোগীর শারিরীক ও মানসিক অবস্থা বুঝে চিকিৎসার পরিধি বা জটিলতা বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপই নেননি।
ম্যারাডোনার পুরোনো মেডিকেল ইতিহাস বিশ্লেষণ করে নিরো জানান, ২০০০ সালে উরুগুয়ে ও পরে আর্জেন্টিনায় চিকিৎসাধীন থাকার সময় ম্যারাডোনার ‘ডাইলেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ ধরা পড়েছিল। এই রোগে হৃদপিণ্ডের পাম্প করার ক্ষমতা হ্রাস পায়। মাদক ও ক্ষতিকর পদার্থ সেবনের কারণে হৃদপিণ্ডের এই ধরনের স্থায়ী ক্ষতি হয়। অথচ মৃত্যুর ঠিক কিছুদিন আগে তাঁর উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ ‘লোসার্টান’ সেবন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল! বিশেষজ্ঞ সাক্ষী হিসেবে নিরো বলেন, ‘সাধারণত কার্ডিওমায়োপ্যাথির জন্য নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করা হয় না। এমনকি হৃদপিণ্ডের পাম্প করার ক্ষমতার উন্নতি হলেও তা চালিয়ে যেতে হয়। কারণ এই অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ ওষুধগুলো কেবল উচ্চ রক্তচাপ নয়, বরং হার্ট ফেইলিওরের চিকিৎসায়ও ব্যবহার করা হয়।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ম্যারাডোনার যে পরীক্ষাগুলো করা হয়েছিল তা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। হৃদপিণ্ডের সঠিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য ‘মায়োকার্ডিয়াল পারফিউশনের’ মতো আরও উন্নত পরীক্ষা প্রয়োজন ছিল, যা সে সময় করা হয়নি। এর আগে অপর এক সাক্ষ্যে আইপেনসা ক্লিনিকের কার্ডিওলজিস্ট অস্কার ফ্রাঙ্কো জানান, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক লিওপোল্ডো লুকো ওই ক্লিনিকে ম্যারাডোনার মায়োকার্ডিয়াল পারফিউশন পরীক্ষা করাতে বাধা দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ডাইলেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি এবং হার্ট ফেইলিওরের কারণে সৃষ্ট তীব্র পালমোনারি এডিমায় (ফুসফুসে পানি জমা) মারা যান ম্যারাডোনা। তাঁর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে বর্তমানে বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের বিচার চলছে। তাদের বিরুদ্ধে ‘সম্ভাব্য ইচ্ছাকৃত হত্যা’র অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন—নিউরোসার্জন লিওপোল্ডো লুকো, সাইকিয়াট্রিস্ট অগাস্টিনা কোসাচোভ, সাইকোঅ্যানালিস্ট কার্লোস ডিয়াজ, চিকিৎসক ন্যান্সি ফোরলিনি, পেদ্রো দি স্পাগনা, নার্সিং কোর্ডিনেটর মারিয়ানো পেরোনি এবং নার্স রিকার্ডো আলমিরন।









