জার্মানির ‘টাইগার’
মধ্যমা দেখিয়ে বাদ, সতীর্থের স্ত্রীকে বিয়ে

১৯৯৪ বিশ্বকাপে স্টেফান ইফেনবার্গের সেই মধ্যমা দেখানোর মুহূর্ত।
ক্যারিয়ারে জিতেছেন ১২টি বড় শিরোপা, যার মধ্যে আছে বায়ার্ন মিউনিখের জার্সিতে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। কিন্তু মাঠের বাইরে ও ভেতরে তার কাণ্ডকারখানা তাকে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে এই বর্ণিল ও বিতর্কিত জীবন নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই জার্মান ফুটবল কিংবদন্তি স্টেফান ইফেনবার্গের। এক সাক্ষাৎকারে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমি সবসময় স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটেছি।’
১৯৬৮ সালের ২ আগস্ট হামবুর্গে জন্ম নেওয়া স্টেফান ইফেনবার্গকে ফুটবল বিশ্বে চেনে ‘ডার টাইগার’ বা ‘বাঘ’ নামে। জার্মানির সেই শৃঙ্খলিত ও নিয়মতান্ত্রিক মিডফিল্ডারদের ছাঁচে তাকে কোনোভাবেই ফেলা যেত না। তিনি ছিলেন একাধারে সাহসী, আক্রমণাত্মক, শারীরিক শক্তির প্রদর্শক এবং অসাধারণ প্লেমেকার। কিন্তু তার এই প্রতিভার সঙ্গেই লেপ্টে ছিল এক আগ্নেয়গিরির মতো মেজাজ এবং নিজ কর্তৃপক্ষের বাইরে যেকোনো ধরনের র্তৃত্বকে তীব্রভাবে ঘৃণা করার মানসিকতা। ইফেনবার্গের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কলঙ্কজনক এবং আলোচিত অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে জার্মানি তখন ৩-২ গোলে এগিয়ে। ম্যাচের ২০ মিনিটের মতো বাকি থাকতে কোচ বার্টি ফোগ্টস ক্লান্ত ইফেনবার্গকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মাঠ ছাড়ার সময় গ্যালারি থেকে জার্মান সমর্থকদের দুয়ো ধ্বনিতে তিনি মেজাজ হারান। কোনো দ্বিধা না করে গ্যালারির দিকে ফিরে হাজার হাজার দর্শকের উদ্দেশ্যে নিজের মধ্যমা তুলে ধরেন।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই ঘটনা তার জাতীয় দলের ক্যারিয়ারকে চিরতরে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফবি) তাৎক্ষণিকভাবে তাকে টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কার করে দেশে ফেরত পাঠায়। পাশাপাশি ১৯৯৬ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের দরজাও তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, এই ঘটনার পরও ইফেনবার্গ কখনো অনুশোচনা করেননি। পরবর্তীতে তার সতীর্থ মারিও বাসলারও মন্তব্য করেছিলেন, ‘যদি তাকে বহিষ্কার করতেই হয়, তবে আরও চার-পাঁচজনকেও করা উচিত ছিল।’ মোনশেনগ্লাডবাখ থেকে ক্যারিয়ার শুরু করে দুই দফায় বায়ার্ন মিউনিখে খেলেন ইফেনবার্গ। ১৯৯৮ সালে ওটমার হিটজফেল্ডের অধীনে বায়ার্নে ফিরে আসার পর ক্লাবটির মিডফিল্ডের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৯৯ সালে তার হাতেই ওঠে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। তার নেতৃত্বে বায়ার্ন টানা তিনবার বুন্দেসলিগা জয়ের পাশাপাশি ২০০১ সালে ভ্যালেন্সিয়াকে হারিয়ে জেতে কাঙ্ক্ষিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি। মিলানের সান সিরোয় অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে সমতায় ফিরিয়েছিলেন তিনি, যা তাকে উয়েফার বর্ষসেরা ফুটবলারের মর্যাদাও এনে দেয়।
মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি এই জার্মান তারকার ব্যক্তিগত জীবনেও বিতর্কের ছড়াছড়ি। বায়ার্ন ও জাতীয় দলের সতীর্থ থমাস স্ট্রুঞ্জের স্ত্রী ক্লাউডিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে জার্মান ফুটবল অঙ্গনে বড়সড় স্ক্যান্ডালের জন্ম দেন ইফেনবার্গ। পরবর্তীতে থমাস স্ট্রুঞ্জের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ক্লাউডিয়াকে বিয়ে করেন। ২০০৩ সালে প্রকাশিত তার আত্মজীবনী ‘ইখ হ্যাবস আলেন গেজেইগট’ (আমি সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছি)-এ সতীর্থ লোথার ম্যাথিউসকে ‘বড়মুখো ও ভীতু’ বলে আক্রমণ করেন এবং বইটিতে ক্লাউডিয়ার সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত ছবিও প্রকাশ করেন, যা তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
২০০৪ সালে ফুটবলকে চিরবিদায় জানানোর পর কোচিং পেশায় নামলেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বর্তমানে জার্মান মিডিয়াতে একজন ফুটবল অ্যানালিস্ট ও কমেন্টেটর হিসেবে কাজ করছেন ইফেনবার্গ। নিজের ফুটবল ক্যারিয়ারের মতো ধারাভাষ্য ও বিশ্লেষণেও তিনি ধরে রেখেছেন সেই আপসহীন ও সরাসরি কথা বলার ভঙ্গি। স্রোতের বিপরীতে চলা সেই ‘বাঘ’ আজও নিজের শর্তেই বেঁচে আছেন।





