শেষ বসন্ত
ম্যারাডোনার ফিটনেস ট্রেনারের মেসি মুগ্ধতা

২০১০ বিশ্বকাপে মেসির সঙ্গে সিগনিওরিতিনি। ছবি : সংগৃহীত
ডিয়েগো ম্যারাডোনার ফিটনেস ট্রেনার হিসেবে কাজ করেছেন প্রায় ১১ বছর। ২০১০ বিশ্বকাপে ছিলেন আর্জেন্টিনার ফিটনেস ট্রেনারও। লিওনেল মেসিকে তখন কাছ থেকে দেখেছেন ফার্নান্দো সিগনিওরিতিনি। মেসির বিদায়ী ম্যাচের আগে এই কিংবদন্তির প্রতি মুগ্ধতাই ঝরল সিগনিওরিতিনির।
পেরুর দৈনিক 'এল কমার্সিও'-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিগনিওরিতিনি বলেছেন,‘ফুটবলের নিখুঁত রূপটির একেবারেই কাছাকাছি পৌঁছে গেছে মেসি। নিজের সহজাত প্রতিভার পাশাপাশি মেসি ভীষণ নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করে। এ জন্য তার পরিবারকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত, ওরা সবসময় তার পাশে থেকেছেন, তাকে সমর্থন জুগিয়েছেন এবং সব ধরনের ঝুঁকি ও মানসিক চাপ থেকে আগলে রেখেছেন। মেসি খেলে শুধু উপভোগ করার জন্য। সে খেলে যেন মানুষ তাকে মনে রাখে।’
মেসিকে নিয়ে তার আরও মুগ্ধতা,‘ফুটবলের সবচেয়ে মৌলিক বিষয় হচ্ছে দূরত্ব, সময় এবং প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার কৌশল। এসব মেসি অন্য যে কারো চেয়ে ভালো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নিজের গতি ও শক্তির ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করতে হয়, কখন সর্বোচ্চটা দিতে হবে আর কখন ছাড় দিতে হবে, সেটা মেসি খুব ভালো করেই জানে।’
ম্যারাডোনার সঙ্গে সিগনিওরিতিনি।
মেসির মতো একজন খেলোয়াড়কে কীভাবে বর্ণনা করবেন জানতে চাইলে সিগনিওরিতিনির উত্তর,‘যেকোনো খেলাধুলো বা শিল্পমাধ্যমের সব প্রতিভাবানদের মতো মেসিও ব্যাখ্যার অতীত। ফুটবলও এক ধরনের শিল্প। যে-ই একে ব্যাখ্যা করতে যাবে, সে আসলে কিছুই বোঝে না। ভেবে দেখুন, মেসির দুজন ভাই আছে, যারা দুজনে চার হাত দিয়ে যা করতে পারবে না, মেসি তার এক বাঁ পা দিয়েই তা করে দেখায়! কীভাবে এটি ব্যাখ্যা করবেন? অসম্ভব। এটি একদমই ব্যাখ্যার অতীত।’
মেসি জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যেতে পারতেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বললেন,‘মেসি চাইলে অবশ্যই পারত। বিশেষ করে কোপা আমেরিকা পর্যন্ত তো নিশ্চিতভাবেই। তবে পুরো বিষয়টা তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছিল।’
মেসি-ম্যারাডোনার মত কিংবদন্তির জন্য কতদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে? এমন প্রশ্নে সিগনিওরিতিনি বললেন,‘কালকেই চলে আসতে পারে, আবার শত শত বছর ধরেও দেখা নাও মিলতে পারে। এগুলো হলো জিনগত অলৌকিক ঘটনা, তাই না? ঠিক যেমন টেনিসে রজার ফেদেরার, গলফে টাইগার উডস কিংবা বাস্কেটবলে মাইকেল জর্ডান। তা ছাড়া, উপযুক্ত পরিবেশ ও সঠিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটাও জরুরি। তাই আমাদের যা আছে তা উপভোগ করা উচিত, আর ভবিষ্যতে কী আসছে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা উচিত।’
ম্যারাডোনার সঙ্গে টানা ১১ বছর কাজ করেছেন তিনি। দীর্ঘ সময়ে সেরা মুহূর্ত বেছে নেওয়া কঠিন বলেই জানালেন সিগনিওরিতিনি,‘নির্দিষ্ট কোনো একটা মুহূর্ত বেছে নেওয়া কঠিন, সেটা অন্যায় হবে। কারণ স্মৃতি ছিল অগুনতি। দীর্ঘ ১১ বছর-ম্যারাডোনার সঙ্গে প্রায় চার হাজার দিন কেটেছে। ভেবে দেখতে পারেন তিনি আমাকে কেমন এক জীবন উপহার দিয়েছিলেন, যা আমি কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি?’
স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালের ১-০ গোলের পরাজয় নিয়ে তৈরি নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বাতিল করে দিয়ে তিনি বললেন,‘এগুলো মানুষের মূর্খতা ও কৌতূহলের ফসল। স্পেন পুরো ম্যাচেই দাপট দেখিয়েছে। তারা সেরা দল ছিল বলেই জিতেছে, ব্যস। আর্জেন্টিনার কাছে একেবারে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে একটা সুযোগ এসেছিল। তবে আর্জেন্টিনা যেমন অনেক সময় যোগ্য না হয়েও জিতেছে, ফাইনালে তেমনই যোগ্য দল হিসেবে হেরেছে।’
১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ টেস্টে ব্যর্থ হয়ে দল থেকে ছিটকে পড়েন ম্যারাডোনা। সিগনিওরিতিনি সেই স্মৃতি স্মরণ করে বললেন,‘ডিয়েগোর শরীরে নিষিদ্ধ উপাদান পাওয়া গিয়েছিল। তাই সাময়িক বহিষ্কার একদম ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তবে পরবর্তীতে তাকে যেভাবে বের করে দেওয়া হয়েছিল, সেটা প্রশ্নবিদ্ধ তারা চাইলেই ডিয়েগোকে রক্ষা করতে পারত। কিন্তু ডিয়েগো সবসময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন, শক্তিশালীদের সমালোচনা করতেন এবং তাদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতেন—তাই সুযোগ পেয়ে তারা ডিয়েগোর ওপর এভাবে প্রতিশোধ নিয়েছিল।’
আর এজন্যই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ দেখেননি বলে জানান সিগনিওরিতিনি,‘যুক্তরাষ্ট্রে খেলা কোনো ম্যাচ দেখেছি? না, একটা ম্যাচও দেখিনি। কারণ ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা লোকগুলোর ভেড়ার পাল হতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গত ৪০ বছর ধরে যা কিছু দেখেছি, ভেবে দেখুন—যা আমি দেখেছি, তা এখন আর দেখতে পাই না এবং ভবিষ্যতেও দেখতে পাব না।’






