রিয়াল মাদ্রিদ
বেলিংহামের স্বাধীনতা উসকে দিলেন মরিনহো

নতুন কোচ আসার খবর শুনলে নানা প্রতিক্রিয়া হয় খেলোয়াড়দের মনোজগতে। কোচ তাকে পছন্দ করবে কি না, তার অবস্থান আগের মতো থাকবে কি না কিংবা উল্টোটা— নিজের পছন্দের পজিশনটা ফিরে পাওয়ারও আশা করে কেউ কেউ। কোচের নাম হোসে মরিনহো হলে তো খেলোয়াড়দের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে বৈকি। তিনি কখন কী করেন, সেটি বোঝা দায়। তাই জুড বেলিংহামও ছিলেন খানিকটা দনোমনো।
কিন্তু এই মৌসুমে পাঁচ ম্যাচ খেলেই রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার ভীষণ খুশি, ‘আমি খুব মজা পাচ্ছি, খেলাটা সত্যিই উপভোগ করছি। এজন্যই মাঠের পারফরম্যান্স এত ভালো হচ্ছে।’ মোট পাঁচ ম্যাচে তার দুই গোল ও তিন অ্যাসিস্টে রিয়ালের শুরুটা যেমন ভালো হয়েছে তেমনি জায়গা করে নিয়েছেন নতুন কোচের গুডবুকেও। রসায়ন জমে গেছে মরিনহো-বেলিংহামে।
অভিষেক মৌসুমের মতোই প্রাণবন্ত
২০২৩-২৪ মৌসুমে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে পা রেখেই বেলিংহাম দ্যুতি ছড়াতে শুরু করেছিলেন। গোলে অভিষেক, পরে পুরো মৌসুমটাই সেই গোলের রোমাঞ্চ ছড়িয়ে আলাদা করে রাখেন নিজেকে। ২৩ গোল করে রিয়ালকে লা লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ উপহার দিয়েছিলেন। দুই মৌসুম বাদে আবার প্রতিপক্ষের রক্ষণে ইংলিশ মিডফিল্ডারের সেই প্রাণবন্ত উপস্থিতি মরিনহোর অধীনে। গোল করছেন ও করাচ্ছেন।
অবশ্য আগের দুই মৌসুমে তার পারফর্মেন্সে খানিকটা ভাটার টানের পেছনে আছে রক্ষণের বাড়তি দায়িত্ব নেওয়া এবং চোট। কাঁধের পুরনো চোট সারাতে অস্ত্রোপচারের টেবিলে যেতে হয়েছিল ২০২৫ সালে, পরের বছর হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে দর্শক হয়েছিলেন টানা ১০ ম্যাচ।
সেই আঁধার কেটে আলো ফুটেছে আবার। দীর্ঘ ইনজুরি কাটিয়ে বেলিংহাম এখন পুরোপুরি ফিট, আত্মবিশ্বাসে টানটান। সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপে থ্রি লায়ন্সদের জার্সিতে দুর্দান্ত খেলা ইংলিশ যুবরাজ সাদা জার্সিতে খেলছেন একই ধারাবাহিকতায়। এর পেছনে আছে বেলিংহামের স্বাধীনতা ও নতুন ভূমিকা। মাঝমাঠ থেকে ফরোয়ার্ড লাইনে যখন যেভাবে ইচ্ছা তিনি সেভাবেই খেলতে পারবেন। শুধু গত মৌসুমের মতো দ্বিতীয় লেফটব্যাক পজিশনে তাকে দেখতে চান না কোচ। অর্থাৎ খুব প্রয়োজন না হলে তার একদম নীচে নামতে মানা।
১০ নম্বর পজিশনে স্বাধীন জুড
পর্তুগিজ ম্যানেজার ৪-২-৩-১ ফরমেশনে বেলিংহামকে মূলত ১০ নম্বরে আরও কার্যকর ভূমিকায় দেখতে চান। তিনি খেলছেন ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পের পেছনে, সঙ্গে অ্যাটাকিং লাইনে যেকোনো জায়গায় স্বাধীনভাবে মুভ করছেন। ফলে দুই লাইনের মাঝে সহজে বল পাচ্ছেন, দ্রুত এগোচ্ছেন সামনে এবং ফরোয়ার্ডদের সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে তৈরি করছেন গোলের সুযোগ।
রিয়াল ম্যানেজার মরিনহো মনে করেন, ‘আমার দৃষ্টিতে এটাই তার সেরা পজিশন। ফরোয়ার্ডদের সঙ্গে তার যে বোঝাপড়া, তাতে সে নিয়মিত গোল করতে পারবে। তাকে গোলের কাছাকাছিই রাখতে হবে। ছয় বা আট নম্বরে খেলালে তার গোল করার দক্ষতাটা হারিয়ে যাবে। আমি এই আক্রমণাত্মক জুডকেই পছন্দ করি।’ এমন স্বাধীনতায় বেলিংহাম কখন আক্রমণে উঠবেন আর কখন নিচে নামবেন, এটা তার ওপর নির্ভর করছে।
রিয়াল মাদ্রিদ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেলিংহামও বলেছেন স্বাধীনতা উপভোগের কথা, ‘আমি এখন অনেক বেশি স্বাধীন বোধ করি— কখন নিচে নেমে বল ধরব, কখন সামনে অবস্থান নেব কিংবা কখন বক্সে ঢুকব, সেই সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারছি। মনে হয় এটাই আমার জন্য সেরা পজিশন।’
মরিনহো চান ভয়ংকর অ্যাটাকিং ত্রয়ী
এখন বেলিংহাম বলের দখল পেলেই দেখা যাচ্ছে ফরোয়ার্ডদের কাছাকাছিই থাকছে তার অবস্থান। এতে করে মিডফিল্ডের সঙ্গে আক্রমণের যোগসূত্রটা সহজ হচ্ছে এবং তার সমন্বয়টা বাড়ছে এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে। তাতে করে ফরোয়ার্ড লাইনে একটা ভয়ংকর ত্রয়ী হওয়ার সুযোগ আছে। আপাতভাবে তাতে গোলের সংখ্যা ও সুযোগ বাড়ছে। মৌসুমের মাঝামাঝি গিয়ে বোঝা যাবে ত্রয়ী কতোটা ভীতিকর।
দলীয় পরিকল্পনায় বেলিংহামের গুরুত্ব নিয়ে কোচ বারবার প্রশংসা করেছেন। শারীরিক, মানসিক ও ট্যাকটিক্যাল ক্ষমতাসম্পন্ন বেলিংহামকে তিনি এক ‘অনন্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এমনকি বেলিংহামকে ব্যালন ডি’অরের অন্যতম দাবিদার হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রিয়াল ম্যানেজারের বিশ্লেষণে, ‘সে এক দুর্দান্ত খেলোয়াড় এবং দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মানসিক শক্তি, ট্যাকটিক্যাল দিক বোঝার ক্ষমতা, যেভাবে সে বল পুনরুদ্ধার করে, প্রেস করে এবং সামনে খেলে— সবকিছুতেই আমি ভীষণ সন্তুষ্ট।’ সঙ্গে আরেকটা সুবিধা হলো বেলিংহামের হেডিং। এই রিয়াল মাদ্রিদে হেডে গোল করার ফরোয়ার্ড নেই, সেখানেও বেলিংহাম হতে পারে বড় সমাধানের নাম।
বেলিংহামের স্বপ্ন
আসলে থমাস টুখেল যেভাবে এই মিডফিল্ডারকে ব্যবহার করেছেন সেটাই যেন ক্লাব ফুটবলে করতে চাইছেন জোসে মোরনিহো। সত্যি বললে, বিশ্বকাপে বেলিংহামের ঘাড়ে চেপেছিল ইংল্যান্ড। এই মিডফিল্ডার ছিলেন তাদের সেরা পারফর্মারদের একজন, আট ম্যাচে করেছিলেন সাতটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট। কারণ ছিল একটাই, তার আক্রমণাত্মক ক্ষমতাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন টুখেল।
বিশ্বকাপের সেই দারুণ অভিজ্ঞতা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে বেলিংহামের আত্মবিশ্বাস। বিশেষ করে যখন রিয়ালে যোগ দিতে তার কিছুটা দেরি হয়েছিল এবং প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতির জন্য সময়ও পেয়েছিলেন কম। এগুলো কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি ২৩ বছর বয়সী মিডফিল্ডারের ক্লাব পারফর্মেন্সে। মৌসুম শুরুর ম্যাচ থেকেই তিনি জ্বলছেন রিয়ালের জার্সিতে। তার সবচেয়ে বড় শক্তিই হলো ম্যাচের সব জায়গায় নিজের প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এটি নতুন কোচের সিস্টেমে তিনি কাজে লাগাচ্ছেন ভালোভাবে।
গত দুটি কঠিন মৌসুম শেষে আবারও নিজের খেলাটা উপভোগ করছেন এই ইংলিশ তারকা। তিনি নতুন করে স্বপ্ন দেখতেও শুরু করেছেন, ‘মরিনহোর সমর্থন ও নির্দেশনা এভাবে বজায় থাকলে এটি হয়তো আমার ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম হতে পারে।’
বিফলে যায়নি ১২৭ মিলিয়ন ইউরো
বেলিংহামকে নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ বোর্ডেরও কোনো সংশয় নেই। স্প্যানিশ সাংবাদিক রামোন আলভারেসের মতে, রিয়াল মাদ্রিদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এরই মধ্যে এই মিডফিল্ডারের বার্ষিক বেতন বাড়ানো এবং চুক্তির মেয়াদ আরও কয়েক বছর বাড়াতে তার ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। ক্লাব তারকাদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার যে নীতি অনুসরণ করে আসছে, এটি তারই অংশ। যেভাবে লম্বা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে।
বেলিংহাম ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে ১২৭ মিলিয়ন ইউরোর বিশাল অঙ্কের চুক্তিতে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছিলেন। মাঠে নেমে তিনি দ্রুতই প্রমাণ করেছেন ক্লাবের বিনিয়োগ অপাত্রে যায়নি। রিয়ালের জার্সিতে তিনি ১৪৫ ম্যাচ খেলে ৪৮টি গোল করার পাশাপাশি ৩৬টি গোলে সহায়তা করেছেন। একজন মিডফিল্ডারের জন্য এটা সত্যিই দারুণ পরিসংখ্যান।






