বিশ্বকাপ বিক্রির প্রস্তাবিত মডেল
বাফুফের টেবিলে ইনফান্তিনোর ২ কোটি ডলারের প্রস্তাব এবং...

প্রতীকী ছবি
ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন অনেক বড়। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য না থাকাটাই আবার মূল সমস্যা। তবে হঠাৎ করেই দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন এক হাস্যোজ্জ্বল মানুষ— হাতে তার একটি সুবিশাল উপহারের চেক।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে ২ কোটি ডলার দেবেন। শুধু বাফুফে নয়, সদস্য ২১১টি দেশই পাবে এই টাকা। কীভাবে? একটি ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন কোম্পানি গড়ে তোলা, যা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় বিশ্বকাপ ফুটবলসহ ফিফার অন্য টুর্নামেন্টগুলো পরিচালনা করবে। এটা হলে প্রত্যেক সদস্য দেশকে ২ কোটি ডলার করে দেবে ফিফা।
ইনফান্তিনো বলেছেন, ‘এখানে কোনো কঠিন শর্ত বা লুকানো নিয়ম নেই! শুধু একটি সই করে দিন, আর খুদে অক্ষরের শর্তগুলো নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না।’ এত বড় অঙ্কের অর্থ হাতে পেলে বাফুফের কতগুলো সমস্যা মিটে যেত বলুন তো?
বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসেই অন্যতম বড় আর্থিক আশীর্বাদ হতে পারে এটা। ২০৩০ সাল পর্যন্ত পরবর্তী বিশ্বকাপ চক্রে ফিফার কাছ থেকে পাওয়ার অনুদানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ৪ কোটি ডলার। আর ফিফার প্রস্তাব পাস না হলে তারা পাবে শুধু ১ কোটি ডলার!
বাফুফের আয়ের বড় উৎস ফিফা
বাফুফের আয়ের সিংহভাগ আসে ফিফার ফান্ড থেকে। অথচ ২০১৮ সাল থেকে ফিফার আর্থিক নিষেধাজ্ঞায় ছিল তারা। অর্থ ব্যয়ে নির্দেশনা না মানায় ফিফা বাফুফেকে অর্থ ছাড়করণ করত বেশি কিস্তিতে। বাফুফেকে পর্যবেক্ষণের পর ফিফা সেই অর্থ ছাড়করণের শিথিলতা প্রত্যাহার করেছে গত বছর মার্চে।
বাফুফের মার্কেটিং
বিভাগের চেয়ারম্যান ফাহাদ করিম সে সময় বলেছিলেন, বাফুফের আর্থিক সংকট কাটতে অন্তত দুই
বছর লাগবে। এর এক বছর কাটলেও দেখা যাচ্ছে জাতীয় দলের জন্য মানসম্মত কোচ আনতে ক্রীড়া
প্রতিমন্ত্রীর সাহায্য চাচ্ছে সংস্থাটি। এলিট একাডেমি চালানো কিংবা বয়সভিত্তিক ও নারী
দলের আন্তর্জাতিক ম্যাচ বা টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ায়ও রয়েছে বাজেট ঘাটতি। এমন সময়ে ফিফার
২ কোটি ডলার পাওয়াটা তো আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতোই। এই টাকাটা পেলে আটকে থাকা অনেক
দুয়ারই খুলে যাবে, যা এতদিন অসাধ্য মনে হতো।
কিন্তু এর বিনিময় মূল্য কী? প্রথম কথা হলো, ওই হাসিখুশি ইনফান্তিনো হঠাৎ দরজায় এসে হাজির হলেন কেন? আর তিনি যে বলছেন ‘কোনো শর্ত নেই’, কিন্তু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বিশাল শর্ত জুড়ে দেওয়া রয়েছে— সেটারই বা অর্থ কী?
বাফুফের শীর্ষ কর্তারা এখন ঠিক এই প্রশ্নগুলোই নিজেদের জিজ্ঞেস করছেন। কারণ ফিফার ইতিহাসে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। ভবিষ্যতের আয়ের একটা বড় অংশ আজকের দিনে বুঝে পাওয়ার বিনিময়ে একটি ভোট দেওয়া। ওই একটি ভোটের মূল্য ২ কোটি ডলার!
বাফুফের এক কর্তা নাম না জানানোর শর্তে বলেছেন, ‘আমরা এটা মাত্রই জেনেছি। তাই পুরো প্রস্তাবটি স্পষ্টভাবে বোঝার চেষ্টা করছি। প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার পর এবং অন্যান্য সদস্য সংস্থা ও কনফেডারেশনের সঙ্গে আলোচনা করেই আমরা নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’
আছে তথ্যের চরম অভাব
খেলাধুলায় বেসরকারি বিনিয়োগ বা এমন বাণিজ্যিক কাঠামো নতুন কিছু নয়। বিশ্বের অনেক বড় বড় ক্রীড়া সংস্থাই তাদের বাণিজ্যিক সত্তা এভাবে পরিচালনা করে— এমনকি ফিফার এই প্রস্তাবের বিপক্ষে এখন যারা সবচেয়ে বেশি সোচ্চার, তারাও একই কাজ করেছে। কারও জন্য এই মডেল সফল হয়, কারও জন্য হয় না। আসল হলো ক্ষমতা কার হাতে থাকছে, কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক দাবিগুলো কীভাবে সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। আর ঠিক এই জায়গাটিতেই তথ্যের চরম অভাব রয়েছে।
ফিফা জোর দিয়ে বলছে, খেলার নিয়মকানুন এবং মূল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকবে, বিনিয়োগকারীদের কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। কিন্তু বিনামূল্যে তো আর কিছু পাওয়া যায় না। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যখন টাকা ঢালবে, কোনো না কোনো উপায়ে তারা লভ্যাংশ চাইবেই। আর সেই চাহিদাই হয়তো ফিফাকে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে, যা শেষ পর্যন্ত ফুটবলের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে।
ব্যবসায়িক হিসাব খুব সহজ, আরও বেশি লাভ চাই। এর মানে হলো— আরও বেশি ম্যাচ, আরও বেশি দল (সম্ভবত ৬৪টি দল), একের অধিক আয়োজক দেশ, খেলার মধ্যে দীর্ঘ পানিপানের বিরতি, বিরতির সময় বিনোদনমূলক কনসার্ট, আকাশচুম্বী মূল্যের টিকিট এবং প্রতিটি জিনিসের অতিরিক্ত দাম। আর ফিফা যদি দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ আয়োজনের সেই অহেতুক পুরনো ভূত আবার ঘাড়ে চাপে, তবে তো কথাই নেই!
ফুটবল উৎসব নাকি ব্যবসা
সংক্ষেপে বললে, খেলাটিকে একটি উৎসব হিসেবে ধরে রাখার চেয়ে ব্যবসা হিসেবে ব্যবহারের চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে। কীভাবে এই বিনিয়োগকারীরা সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে না মেরে তাদের লভ্যাংশ তুলে নেবে? ফিফার মৌখিক আশ্বাস ছাড়া এই মূল প্রশ্নের কোনো উত্তর এখনো মেলেনি।
ইউরোপের ধনী ও ক্ষমতাধর দেশগুলোর মতো বাফুফের বিলাসবহুল নীতিগত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই। বাফুফের সামনে বিশাল অঙ্কের টাকার প্রস্তাব ঝুলে আছে, আর তারা একা বিপক্ষে ভোট দিলেই যে এই পরিকল্পনা আটকে যাবে— এমন ভাবনাও অবাস্তব। ২১১টির মধ্যে তাদের ভোট মাত্র একটি। বেশিরভাগ দেশের কাছে এই টাকার নগদ সুবিধা চোখের সামনে স্পষ্ট, আর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিগুলো এখনো অস্পষ্ট ও তাত্ত্বিক। আর ঠিক এ কারণেই ইনফান্তিনো নিশ্চিত যে, প্রস্তাবটি পাস হয়ে যাবে।
বাফুফের কর্তাদের এখন বিপরীতমুখী দায়িত্ব দুটি। একদিকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া খেলাটিকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ফুটবলের মূল রূপটিকে রক্ষা করা। তাদের যে আইনি দায়িত্ব রয়েছে, তাতে ২ কোটি ডলারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার মতো খুব বড় কোনো যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে। আবার একই সঙ্গে ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করার দায়িত্বও তাদের কাঁধে। এ দুটি বিষয় সবসময় এক রেখায় চলে না।






