মেসিহীন নতুন আর্জেন্টিনার সাফল্যের রেসিপি

সংগৃহীত ছবি
লিওনেল মেসি এখনও বিদায়ী ম্যাচটা খেলেননি। এর আগেই মেসিহীন আর্জেন্টিনাকে দারুণ কৌশলে সাফল্য এনে দিলেন লিওনেল স্কালোনি। বলিভিয়ার বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়ে নতুন যুগের নিজস্ব পরিচয় ফুটিয়ে তুলেছে আর্জেন্টিনা।
মেসি থাকার সময় একাদশে হুলিয়ান আলভারেস নাকি লাউতারো মার্তিনেস-এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হত স্কালোনিকে। মেসি পরবর্তীযুগে দুই ফরোয়ার্ডকেই একসঙ্গে খেলালেন কোচ।
এমি মার্তিনেস; অগাস্টিন জিয়াই, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেস, রোমান ভেগা; এক্সেকিয়েল পালাসিওস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, নিকো পাস, জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি; লাউতারো মার্তিনেস এবং হুলিয়ান আলভারেসকে নিয়ে ৪-৪-২ ফর্মেশন বেছে নিয়েছিলেন।
কৌশল ছিল-পাঁচটি লেন বা চ্যানেল দখল করে রাখা, ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতায় অবস্থান নেয়া এবং গতিতে ক্রমাগত পরিবর্তন এনে মাঠের বিস্তার বাড়ানো, প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের মাঝখানটায় জটলা তৈরি করা এবং সুযোগ বের করে নেয়া।
পাঁচটি লেন, ভিন্ন উচ্চতা এবং গতির পরিবর্তন
প্রথম কৌশলগত চাবিকাঠি ছিল মাঠের পাঁচটি লেনই দখল করে রাখা, তবে সেটি কেবল এক লাইনে সমান্তরালভাবে ছিল না। আর্জেন্টিনার লক্ষ্য ছিল জিয়াই ও ভেগাকে একদম ওয়াইডে রাখা, নিকো পাস ও প্রেস্তিয়ান্নিকে স্বাধীনভাবে ভেতরে ঢুকে খেলার সুযোগ দেয়া এবং দুই ফরোয়ার্ডকে পর্যায়ক্রমে আক্রমণের অবস্থান বদল করতে দেয়া। পাঁচটি লেন কখনোই একই উচ্চতায় বা একই গতিতে ব্যবহার করা হয়নি।
• জিয়াই যদি রাইট-ফ্ল্যাঙ্ক ধরে দ্রুত আক্রমণে উঠে যান, তখন নিকো পাস ভেতরে ঢুকে তার সঙ্গে লিঙ্ক-আপ করতে পেরেছেন।
• ভেগা যদি বাম পাশ দিয়ে এগিয়ে যান, প্রেস্তিয়ান্নি বলিভিয়ার ডিফেন্সকে টেনে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন এবং তারপর ভেতরে ঢুকে ছোট ছোট পাস খেলেছেন।
আর্জেন্টিনা মূল আক্রমণটা মাঝখান দিয়ে করার জন্যই মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। দুই পাশের উইং দিয়ে খেলা তৈরি করা আক্রমণের শেষ গন্তব্য ছিল না, বরং সেটা ছিল ভেতরে জায়গা করে নেয়ার কৌশল মাত্র।
লাউতারো সেন্টার-ব্যাকদের পেছনের ফাঁকা জায়গায় দৌড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে হুলিয়ান একই এলাকা থেকে শুরু করলেও বলিভিয়ার তিন ডিফেন্ডারের একজনকে সরিয়ে নিতে ছোট ছোট পাস খেলার চেষ্টা করেন (এমনকি বল না পেয়েও)। এই পজিশন বদলের ফলে মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের আক্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়।
হাই প্রেস
প্রথম দুটি গোলেই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ । ম্যাক অ্যালিস্টার, পালাসিওসের সঙ্গে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের উচ্চতা বা অবস্থান এক ছিল না। ম্যাক অ্যালিস্টার সাধারণত ১০ থেকে ১৫ মিটার সামনে অবস্থান নেন, যেন বল পেয়েই সরাসরি আক্রমণাত্মক পাস বাড়াতে পারেন। ঠিক এভাবেই প্রথম গোলটি আসে—মাঝখান দিয়ে দ্রুত আক্রমণে লাউতারোর শটে গোল হয়।
দ্বিতীয় গোলটি এই সমন্বয়কে আরও দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলে। পালাসিওস একটি থ্রু-বল বাড়ান নিকো পাসের দিকে, এবং কোমো থেকে আসা এই তরুণ খেলোয়াড় অসাধারণ দক্ষতায় ফিনিশিং করেন।
এই আক্রমণের পেছনে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার ছিল। আর্জেন্টিনা আক্রমণ করেছিল, বল বলিভিয়ার গোলরক্ষকের হাতে গিয়েও পৌঁছেছিল, কিন্তু দল পিছিয়ে আসেনি। তারা উঁচু পজিশনেই থাকে, মাঠের জায়গা সংকুচিত করে ফেলে, প্রতিপক্ষের অর্ধে গিয়ে তীব্র চাপ (হাই প্রেস) সৃষ্টি করে, প্রতিপক্ষকে পাশের দিকে পাঠাতে বাধ্য করেছে এবং আক্রমণের শেষ তৃতীয়াংশে আবার বল পুনরুদ্ধার করে। সেখান থেকেই তারা আরেকটি সরাসরি আক্রমণ চালিয়ে গোল আদায় করে নিয়েছে।
৪-০ গোলের ব্যবধানেও এই আক্রমণাত্মক আধিপত্য ফুটে উঠেছে। ভেগা উঁচুতে উঠে প্রেস করে যে ফাউলটি আদায় করেছিলেন, সেই সেট-পিস নেন নিকো পাস এবং বক্সে গিয়ে রোমেরো দলের তৃতীয় গোলটি করেন।
চতুর্থ গোলটি ছিল ফ্লোরেসের একটি দুর্দান্ত ছক, যা শেষের দিকে কিছুটা অগোছালো হয়ে গেলেও ফ্লাকো লোপেস দূরের পোস্ট দিয়ে গোলরক্ষক ভিসকারাকে পরাস্ত করে গোলটি আদায় করেন।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও কিছু প্রশ্ন
এই বড় জয় বিশ্বকাপ-পরবর্তী এবং মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার প্রথম এক ঝলক দেখাল, তারা ১০ নম্বর জার্সির কোনো একক বিকল্প খুঁজছে না, বরং এমন একটি দলগত কাঠামো তৈরি করতে চাইছে যা দায়িত্ব এবং আক্রমণের তীব্রতা সবার মধ্যে ভাগ করে দিতে পারে।
খেলোয়াড়িদের জায়গা পরিবর্তন আর গতির পরিবর্তন একক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, যখন একজন বল ধরে রাখছেন তখন অন্যজন ডিফেন্স ভাঙছেন; যখন একজন খেলা ছড়িয়ে দিচ্ছেন, অন্যজন নিচে নেমে আসছেন; যখন একজন গতি বাড়াচ্ছেন, অন্যজন ভিন্ন উচ্চতায় গিয়ে হাজির হচ্ছেন। এজন্য বলিভিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বল পাসিং ছিল যেমন জটিল, তেমনই নিখুঁত। বলিভিয়া কখনোই এই কাঠামোকে পরীক্ষায় ফেলার মতো সুযোগ পায়নি।
আর সেখানেই একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন থেকে যায়। যখন শুরুর ধাপে এই আক্রমণ এতটা নিখুঁত হবে না এবং ফুল-ব্যাকরা ওপরে ওঠা, মিডফিল্ডাররা সামনে বাড়ানো এবং সেন্টার-ব্যাকরা নিজেদের গোলপোস্ট থেকে অনেক দূরে থাকা অবস্থায় আর্জেন্টিনা বল পজেশন হারাবে, তখন আসলে কী ঘটবে?
বল হারানোর পর প্রতিপক্ষকে চেপে ধরা এই ঝুঁকি কমানোর একটা উপায় হতে পারে, তবে যে প্রতিপক্ষ এই প্রাথমিক প্রেস কাটিয়ে উঠে আক্রমণ করতে সক্ষম, তাদের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই রক্ষণভাগ কীভাবে সামাল দেয়—সেটা দেখার জন্য আরও বড় কোনো পরীক্ষার অপেক্ষায় থাকতে হবে।
বলিভিয়ার বিপক্ষে প্রশ্নটি উঠেছে , তবে উত্তর পাওয়ার জন্য আরও কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়তে হবে স্কালোনির দলকে।




