বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক বসন্তদিন

ক্রিকেট শুধু মাঠের খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে রূপকথাকে হার মানানো গল্প। স্কোর বোর্ডের সংখ্যাগুলোও লুকোচুরি খেলে বাস্তবের সঙ্গে। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্টের প্রথম দিনটি এমনই এক দিন, যা বিশ্বাস করার আগে নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখতে হয়েছে, এ সবকিছু সত্যি সত্যি ঘটছে তো!
সিরিজ শুরুর আগে চারদিকে আলোচনা ছিল, টেস্ট ম্যাচ কত দিনে গড়াবে। অস্ট্রেলিয়া যখন হিমালয়ের উঁচুতে দাঁড়িয়ে, বাংলাদেশ পড়ে আছে সেই পথের মাঝামাঝিতে। তাই পঁাচ দিনের টেস্ট নিয়ে আশঙ্কার মেঘ দেখছিলেন কেউ কেউ। অথচ প্রথম দিনের সূর্য ডোবার আগেই সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণরা। কত দিনে ম্যাচ শেষ হবে— এ প্রশ্ন ছাপিয়ে অনেকের গর্বিত উচ্চারণ— শাবাশ বাংলাদেশ!
অস্ট্রেলিয়ার ছিল শক্তির অহংকার। স্টার্ক, কামিন্স, হ্যাজেলউড— এ ভয়ংকর পেস ত্রয়ী নিয়ে তাদের দুর্দান্ত সাজ। বিপরীতে বাংলাদেশের ম্যাচ উইনার ফাস্ট বোলার নাহিদ রানাকে হারানোর শোক। সাম্প্রতিককালে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করা এ ফাস্ট বোলার চোটে ছিটকে গেছেন এই সিরিজের আগে। তবে এক অস্ত্রকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন খুলে দিয়েছে তার পুরো অস্ত্রাগার। হাসান মাহমুদ ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে নিজেকে আলাদা করে চেনালেও, তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন ২টি করে উইকেট নিয়েছেন।
হাসান মাহমুদের বলে হয়তো আগুনের তীব্রতা ছিল না, তবে নিখুঁত লাইন-লেন্থের শাসনে অজি ব্যাটারদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলে নিলেন একের পর এক উইকেট। বলের গতির চেয়ে নিয়ন্ত্রণই যে বড় অস্ত্র হতে পারে, ডারউইনের মাটিতে সেটিই দেখালেন বাংলাদেশের এ তরুণ পেসার।
মাত্র ২ রানে স্টিভেন স্মিথ জীবন না পেলে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের চেহারাটা আরও করুণ হতে পারত। প্রথম দিন একবারের জন্যও মনে হয়নি অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে ফিরছে। বরং প্রতিটি মুহূর্তে বাংলাদেশের বোলিংয়ের সামনে তাদের ব্যাটিং দিশাহারা মনে হয়েছে। উইকেট পড়েছে, আশা ভেঙেছে আর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস গড়িয়ে থেমেছে মাত্র ১৯৮ রানে। পরাশক্তির ব্যাটিং দুর্গে একের পর এক কামান দাগার পর ধ্বংসস্তূপের চেহারা নিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস।
এটা পুষিয়ে দিতে পারত বোলিং দিয়ে। সেটাও পারেনি অজিরা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের বসন্তদিন রচনার পুরো ভার নিয়েছিলেন লাল-সবুজের ক্রিকেটাররা। বোলারদের পর ব্যাটাররাও সেই গল্প লিখতে শুরু করেন নতুন আত্মবিশ্বাসে। দিনের শেষ আলোটুকু ডারউইনের আকাশ থেকে মুছে যাওয়ার আগে ১ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৯৬ রান। অস্ট্রেলিয়ার ভয়ংকর পেস ত্রয়ীও পারেনি ভয় ধরাতে।
এই দেখে সাবেক অজি তারকারাও খানিকটা বিস্মিত বৈকি। সাবেক অজি ওপেনার ম্যাথু হেইডেনও প্রশংসায় ভাসিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের এটি একটি চমৎকার দিন। তারা নিখুঁতভাবে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। বিশ্বের সেরা ও ফেভারিট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এ সিরিজের আগে তারা কতই না প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিল!’
অন্তত প্রথম দিন সব প্রশ্ন চাপা পড়েছে প্রশংসায়। দিনের শুরুতে যে গল্পের মঞ্চে অস্ট্রেলিয়া ছিল পরাশক্তির চরিত্রে, সন্ধ্যা নামার আগেই সেই মঞ্চের আলো ঘুরে গেছে বাংলাদেশের দিকে। জন্ম নিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক বসন্তদিনের।









