সেই মুমিনুলের ব্যাটেই এলো মাহেন্দ্রক্ষণ

ক্রিকেটার মুমিনুল হক
বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি অন্যায়ের শিকার হওয়া মানুষটা খুব সম্ভবত মুমিনুল হক। ‘টেস্ট ক্রিকেটার’ তকমা দিয়ে তাকে ওয়ানডে থেকে বসিয়ে রাখা হয়েছে, বিপিএলেও কোনো দল তার প্রতি আগ্রহ দেখায় না। দলের সংকটের সময়ে তার ওপর অধিনায়কত্বের দায়িত্ব চাপিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা, আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অপমান করেই। ডারউইনে বাংলাদেশের জয়টা নিশ্চিত হলো সেই মুমিনুলের ব্যাট থেকে আসা বাউন্ডারিতেই। বিউ ওয়েবস্টারের বলে কাট শট খেললেন মুমিনুল, বলটা সীমানা দড়ির ওপারে যেতেই আনন্দের বিস্ফোরণ ডাগআউটে আর এক টুকরো বাংলাদেশ হয়ে ওঠা মারারা ওভালের গ্যালারিতে। অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ, গত ৩০ বছর ভারত বাদে এশিয়ার অন্য কোনো দল যে কাজটা করে দেখাতে পারেনি, সেটাই যে করে দেখাল নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
সাকিব আল হাসান যখন জুয়াড়ির সঙ্গে যোগাযোগ গোপনের অপরাধে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হন, তখন তড়িঘড়ি করে টেস্ট অধিনায়ক বানিয়ে দেওয়া হয় মুমিনুলকে। ভারত সফরে ইন্দোরে টেস্ট খেলতে মুমিনুলরা পৌঁছে গিয়েছিলেন আগে, তার ক্যাপ্টেনস ব্লেজার ঢাকা থেকে পরে নিয়ে যান এক সাংবাদিক! মুমিনুলের টেস্ট অধিনায়কত্বের বেশিরভাগ সময়ই বিশ্বে ছিল কভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ-পরবর্তী পদক্ষেপে জৈব সুরক্ষায় মোড়ানো। তাতে নানান কড়াকড়ি, ভ্রমণ সতর্কতা। নিউজিল্যান্ড সফরে সাকিব আল হাসান যাননি লম্বা সময় জৈব সুরক্ষাবলয়ের ভেতরে থাকার কড়াকড়ির কারণে। চোটের কারণে ছিলেন না তামিম ইকবালও। সেরা খেলোয়াড়দের ছাড়াই মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে মুমিনুলের নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। ইবাদত হোসেন দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন কিউইদের। সেটিই বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি পেসারের বড় সাফল্য, যে সাফল্যের বীজটা বুনেছিলেন মুমিনুল। তার আগের অধিনায়করা টেস্টে পেসারদের একাদশে রাখতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। দেশের মাটিতে টেস্টে পেসারদের হাতে বলই দেওয়া হতো না। সিলেট স্টেডিয়ামের উদ্বোধনী টেস্টে বাংলাদেশের একাদশে পেসার ছিলেন দেড়জন! আবু জাহেদ রাহির সঙ্গে নতুন বল দেওয়া হয়েছিল মিডিয়াম পেসার আরিফুল হককে! ২০১৯ সালে ঘরের মাঠে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে বাংলাদেশ একাদশে রেখেছিল চার স্পিনার, ছিলেন না কোনো পেস বোলার। মুমিনুল এই সংস্কৃতিতে প্রথম পরিবর্তন আনেন। একাদশে পেসারদের সুযোগ দেন, যে কথাটা ফুটে উঠেছে বর্তমান অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর কথায়ও, ‘টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন (পেসারদের মানসিকতায় পরিবর্তন)। পাঁচ বছর আগেও পেসাররা টেস্ট খেলতে চাইত না। কিন্তু এখন আমরা অনেক টেস্ট ক্রিকেট খেলছি এবং তারাও টেস্ট ফরম্যাটকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা খেলতে চায়, পারফর্ম করতে চায়, বিশ্বমানের হতে চায়। এখন তাদের মানসিকতাই এমন। মুশফিক ও মুমিনুলের মতো সিনিয়র খেলোয়াড়রাও তাদের বেশি করে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে উৎসাহিত করেছেন।’
দেশের ভেন্যুগুলোর উইকেটের চরিত্র পরিবর্তন করা, পেসারদের ওপর আস্থা রাখা আর ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ডিউক বলের ব্যবহারের সঙ্গে উইকেটে ঘাস রাখার নিয়মটাই বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের টেস্ট সংস্কৃতি। দেশের বাইরে বাংলাদেশের বড় জয়গুলো এসেছে পেসারদের সাফল্যেই। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে ইবাদত, পাকিস্তান সফরে হাসান মাহমুদ ও নাহিদ রানা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে জ্যামাইকা টেস্টে নাহিদ রানা ও সবশেষ ডারউইনে হাসান মাহমুদের ৯ উইকেট শিকারই বলে দেয়, বিদেশে টেস্ট জয়ের নেপথ্যে পেসারদের অবদান কতখানি।
সি এল আর জেমসের সেই অমর বাণী, ‘তারা ক্রিকেটের কী জানে, যারা শুধু ক্রিকেটই জানে’, এখনো প্রাসঙ্গিক। স্কোরকার্ডে লেখা থাকবে না, সাত বছর আগে কীভাবে মুমিনুলের হাত ধরে বদলে গিয়েছিল সংস্কৃতি। লেখা থাকবে না হাসান মাহমুদ লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে মাত্র তিন ম্যাচ খেলে চলে গিয়েছেন টেস্ট দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে প্রস্তুতি ম্যাচে খেলতে। তাসকিন আহমেদ টেস্টের প্রস্তুতির জন্য এলপিএলে ডাক পেয়েও সরে দাঁড়িয়েছেন। ইবাদত হোসেন চলে গিয়েছিলেন সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর পাশে ইতালিতে। ছুটিও মঞ্জুর হয়েছিল, নাহিদ রানা চোটে পড়ায় জীবনের অন্যতম আনন্দের মুহূর্তকে বিসর্জন দিয়েই ইবাদত চলে গেছেন ডারউইনে। অথচ এই বাংলাদেশ দলেই অতীতে দেখা গেছে সাকিব আল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমানদের মতো শীর্ষ ক্রিকেটারদের নানান অজুহাতে টেস্ট থেকে সরে দাঁড়াতে।
ডারউইনে প্রথম ইনিংসে ১ রানের জন্য হাফসেঞ্চুরি হয়নি মুমিনুলের, তার ব্যাটেই এলো উইনিং রান। এভাবেই প্রকৃতি যেন প্রতিদান দিল মুমিনুলকে। একটা সময় টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে ছিলেন উপেক্ষিত, এখন মুমিনুলই ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্যের নেপথ্য সূত্রধর।






