বাংলাদেশ অলিম্পিক বনাম ফেডারেশন

অলিম্পিক ভবন
বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো। এ লড়াইয়ে আপাতত জয় হয়েছে ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটির মোর্চার। বিওএকে তাদের পছন্দের কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে এশিয়ান গেমসের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছে ২৭ ক্রীড়া ফেডারেশনের নবগঠিত অ্যাডহক কমিটির ২২ সদস্যকে। এটিকে তারা দেখছে নৈতিক বিজয় হিসেবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্রীড়াঙ্গন সংস্কারের নামে বিভিন্ন ফেডারেশনে দেওয়া হয়েছিল অ্যাডহক কমিটি। তাদের অংশগ্রহণ ও কাউন্সিলরদের ভোটে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনেও আসে নতুন কমিটি। মহাসচিব হন জোবায়েদুর রহমান রানা, নির্বাহী কমিটিতে জায়গা পান ফেডারেশনের বিভিন্ন প্রতিনিধিরা। কয়েক মাসের ব্যবধানে নির্বাচিত সরকার এসে ২৭টি ফেডারেশনে নতুন অ্যাডহক কমিটি দিলে বদলে যায় ক্রীড়াঙ্গনের দৃশ্যপট। বেশিরভাগই পুরনো সংগঠক। এর আগে বিওএ পুরনো কমিটির লোকজন নিয়ে এশিয়ান গেমসের দল চূড়ান্ত করে ফেলে। কিন্তু ফেডারেশনের কমিটি যে বদলে গেছে। তাই নতুন কমিটির সদস্যদের জাপানে এশিয়ান গেমস ভ্রমণের দাবিও উপেক্ষা করা যায় না। বিওএ ছলেবলে উপেক্ষা করতে গিয়েছিল আর তাতেই সৃষ্টি হয়েছে বিরোধ। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কিও হয়েছে। শেষমেশ বিওএ সভাপতি ও সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে অন্তর্ভুক্ত হয় নতুন কমিটির ২২ সদস্য।
এশিয়ান গেমস সামাল দেওয়া গেলেও বিওএর নির্বাহী কমিটিতেই যে ফেডারেশনগুলোর প্রতিনিধিত্ব থাকছে না। এ কমিটিতে এখন ১৪ জন আছেন, যারা আর বিভিন্ন ফেডারেশনের কমিটিতে নেই। যেমন গুরুত্বপূর্ণ খেলা হকির সংশ্লিষ্ট কেউ নেই বিওএর কমিটিতে। এক্ষেত্রে বিওএর মহাসচিব জোবায়েদুর রানার স্পষ্ট কথা, ‘তাদের বিওএর কমিটি থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। আবার নির্বাচন হলে নতুন কাউন্সিলর দেওয়ার সুযোগ পাবে ফেডারেশনগুলো, তখনই পরিবর্তন সম্ভব।’ অর্থাৎ প্রতিনিধি ছাড়াই চলতে হবে ফেডারেশনগুলোকে।
তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সার্চ কমিটির, ক্রীড়াঙ্গনের নীতিমালা করার জন্য। কিন্তু তারা নিজেরাই বসে গেছেন অলিম্পিকের চেয়ারে
সাধারণ সম্পাদক
সাঁতার ফেডারেশন
জাতীয় নির্বাচনের আগে বিওএ নির্বাচন সেরে ফেলায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। সাঁতার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আমিনুল হক দেওয়ান সজলের অভিযোগ, ‘বিওএ মহাসচিব উদার নন। তার আরেকজন সঙ্গী আছে, তিনি তো সবজান্তা সমশের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ে গেছেন জ্ঞানপাপী। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সার্চ কমিটির, ক্রীড়াঙ্গনের নীতিমালা করার জন্য। কিন্তু তারা নিজেরাই বসে গেছেন অলিম্পিকের চেয়ারে, এতটাই ক্ষমতালিপ্সু তারা।’
মহাসচিব জোবায়েদুর রানা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মেজর (অব.) ইমরোজকে নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে আছে নানা মুখরোচক গল্প। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট ক্রীড়াঙ্গনে সংস্কারের জন্য গঠন করা হয়েছিল পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি, যার আহ্বায়ক ছিলেন রানা আর ইমরোজ ছিলেন সদস্য। অফিস আদেশ অনুযায়ী, ‘ক্রীড়া ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশন, বোর্ড ও সংস্থাগুলোর গঠনতন্ত্র এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব’ করাই ছিল সার্চ কমিটির কাজ। এটির কতটা কী করেছেন, তা অজানা থাকলেও দৃশ্যমান হয়েছে তাদের ফেডারেশনের কমিটি গঠনের কাজ। অথচ তা লেখাই ছিল না অফিস আদেশে।
অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের এক সদস্য বলেছেন, ‘ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটি গঠনেই ছিল তাদের ম্যাজিক। যেন ওসব কমিটির লোকজনই ওই দুজনকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করে বসিয়ে দিতে পারে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনে। এটাকেই বলে ম্যাটিকুলাস প্ল্যান। এতে যে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হয়, সেটাও মনে রাখেনি তারা।’
ব্যাপারটা হয়ে গেছে বেড়া ক্ষেত খেয়ে ফেলার গল্পের মতো। গরু-ছাগলের হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য কৃষক চারদিকে দিয়েছিল বেড়া। একসময় দেখা গেল সেই বেড়া-ই খেয়ে ফেলেছে ক্ষেত। তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ বিওএ মহাসচিব রানা, ‘কীসের কনফ্লিক্ট? সার্চ কমিটির কাজ দেওয়ার সময় কাগজে কী লেখা ছিল, আমরা নির্বাচন করতে পারব না। এসব কিছু লোকের মনগড়া কথা।’ এরপর তিনি বিওএ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে বললেন, ‘ক্রীড়া পরিষদ চাইলে ফেডারেশনের কমিটি ভাঙতে পারবে, কিন্তু বিওএ ভাঙতে পারবে না। তখন আইওসি থেকে নিষেধাজ্ঞা আসবে বাংলাদেশের ওপর।’
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও জানেন বিওএ নির্বাহী কমিটি ফেডারেশনগুলোর প্রতিনিধিত্বহীন হয়ে পড়েছে। কিন্তু তড়িঘড়ি না করে তিনি অপেক্ষা করতে চান, ‘আমরা ২৭টি ফেডারেশনে অ্যাডহক কমিটি দিয়েছি। জেলায়ও পরিবর্তন হবে। ফেডারেশনগুলোতে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করি। এখনই হুট করে কিছু করতে চাই না। সময় বলে দেবে কী করতে হবে।’







