ভালোবাসার মহাতীর্থে জাদুকরের বিদায়

দশ বছর আগেও এমন আবেগ-ভালোবাসায় মোড়ানো দিনের কল্পনা করা যায়নি। বুয়েনস এইরেস বা মনুমেন্তাল তখনো মেসিকে বুকে টেনে নিতে দ্বিধা করত। যেন নিজ গৃহেই তিনি এক নিঃসঙ্গ অতিথি। ম্যারাডোনার রাজকীয় ছায়ার কাছে বারবার থমকে যাওয়া দূর গ্রহের বাসিন্দা। ন্যু ক্যাম্পের জাদুকরের সঙ্গে ছিল এক নীরব দূরত্ব। ম্যারাডোনার সেই আদিম, বাঁধনহারা ভালোবাসার মসনদে নিভৃতচারী শিল্পী কীভাবে হানা দেবেন!
তার উপায় একটাই— বিশ্বকাপ জয়। সেটাও মেসি পারছেন না, অপেক্ষা দীর্ঘতর হচ্ছে। অবশেষে ২০২২ সালে ফুটবল ঈশ্বর মিলিয়ে দেন জাদুকরের বিশ্বকাপ অঙ্ক। সুবাদে প্রত্যাখ্যান ও বুকভাঙা যন্ত্রণার দিন পেরিয়ে মেসি বসেন বিজয়ের সিংহাসনে। এবারও আমেরিকা বিশ্বকাপে তিনি পৌঁছে যান ফাইনালের মঞ্চে। সেখানে হারলেও ভালোবাসার আলিঙ্গন একটুও আলগা হয়নি। বরং ম্যারাডোনার ছায়া পেরিয়ে মেসি ততদিনে পৌঁছে গেছেন অপার্থিব উচ্চতায়, যেখানে কোনো তুলনা পৌঁছাতে পারে না। তাই গতকাল বুয়েনস এইরেসের আকাশ যেন বুক চিরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। ফুটবল জাদুকরকে বিদায়ের বেদনা ও ভালোবাসায় অশ্রুসজল পুরো আর্জেন্টিনা।
আকাশি-শুভ্র পতাকায় ঢেকে যাওয়া মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম খেলা ছাপিয়ে রূপ নিয়েছিল এক ভালোবাসার মহাতীর্থে। বিদায়ী ম্যাচে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা, দুটি অ্যাসিস্টের পর শেষ গোলটিও ফুটবল জাদুকরের। এরপর মেসির বিদায়ী ভাষণ শুনেই কেঁদেকেটে একাকার এনসো ফের্নান্দেসরা। তবে বিদায়যাত্রার শুরুতে এসেইসা ট্রেনিং কমপ্লেক্স থেকে মনুমেন্তালের বাস ছাড়ার সময় মেসির চোখেমুখে ছিল বিষণ্নতার ছায়া। ভক্তদের চোখে আবেগ দেখে নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না বিশ্বকাপে দুবারের সেরা খেলোয়াড়।
এই বাস মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে আসতেই লেগে যায় এক ঘণ্টা। ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীতের সুরে ভেসে গেলেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। দশম মিনিট পর ক্ষণিকের বিরতি যেন উপস্থিত সবাই ফুটবলের মহানায়ককে সম্মান জানাতে পারে। স্টেডিয়াম জুড়ে করতালির ঝড়, আতশবাজিতে আলোকিত চারপাশ। বেনিনের খেলোয়াড়রাও এগিয়ে যান তার দিকে। ম্যাচ আবার শুরু হয় এবং দ্বিতীয়ার্ধে চিরচেনা মেসি-দাপটে শেষ হয়। এরপর বিদায়ী সংবর্ধনা পর্ব। মাইক্রোফোন হাতে নিয়েই জাদুকর বিয়োগ-ব্যথায় কাতর, ‘জাতীয় দলে আর না ফেরাটা ভীষণ কষ্টের হবে। আমি সবসময় এখানে ফিরে আসতে চাইতাম, কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলাটাই এ জীবনের সেরা ঘটনা।’
আলবিসেলেস্তে জার্সি এখন তার জীবনের অমূল্য স্মৃতি। এ সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়ার ক্ষণে তিনি বলেছেন, ‘আমি নিশ্চিতভাবেই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দুঃখের দিনটি পার করছি। আমি জাতীয় দল এবং আপনাদের সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর অনুভূতিটা আমি খুব মিস করব।’
আকাশি-সাদা জার্সিতে আর্জেন্টাইন ফুটবলের রাজপুত্রের দুই দশকের পথচলা। যাত্রাপথে ছিলেন ৯ সুরকার। কিন্তু কেউই পারছিলেন না সেই কাঙ্ক্ষিত সুরটি বাঁধতে। কখনো পিয়ানোর তার ছিঁড়ে গেছে, কখনোবা সুরের মূর্ছনা মেলেনি অন্যদের সঙ্গে। লিওনেল স্কালোনিই পেরেছিলেন সব ঠিকঠাক মেলাতে। মহান শিল্পীর বিদায়ের লগ্নে তাই একরাশ বিষণ্নতা নিয়েও এ কোচের উপলব্ধি, ‘এই রাতটা তার প্রাপ্য ছিল। এই জার্সিতে এমন একটি রাত না পেয়ে ওর যাওয়াটা মানায় না। কারণ, এমন কিছুর আর পুনরাবৃত্তি হবে না, এটা অসম্ভব। আবার এমন কিছু হতে হলে তাকে এলিয়েন বা ভিনগ্রহের প্রাণী হতে হবে। এটা অসম্ভব হবে...।’
সত্যিই অসম্ভব। এখানে ট্র্যাজেডি হয়ে উঠেছে এক মহামিলনের মহাকাব্য। তাই শুরুর নিঃসঙ্গ অতিথিটি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত থাকবেন নীল-সাদা সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে।



