মানবিক মূল্যবোধ বিকশিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

একজন শিশুর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত রচনা করেন যে প্রাথমিক শিক্ষকরা, অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল তারা। সমাজের মানুষও তাদের গুরুত্ব দেয় না। দুর্বল ভিতের ওপর ভালো দালান তৈরি করা যায় না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানের দিকে নজর না দিলে সার্বিকভাবে শিক্ষার অগ্রগতি দুরাশা
২০৫০ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কজন শিক্ষাবিদ বাংলাদেশে এলেন আমাদের শিক্ষার বিভিন্ন বিষয় জানতে। কারণ, তারা জানেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রচলিত মানদণ্ডে তো বটেই, নানা দিক দিয়েই অনুসরণীয়। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন গণিত, বিজ্ঞান ও যুক্তিতে দক্ষ, তেমনি ভাষাগত দিক দিয়েও তারা ঈর্ষণীয় সফলতা দেখিয়েছে, দেখাচ্ছে। পাশাপাশি, মানবিক আচরণ কিংবা পরিবেশ-সচেতনতা ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কথা উচ্চারিত হয় প্রায়ই।
তারা দেখতে এসেছেন, কী করে এই অল্প সময়ে বাংলাদেশ উন্নতিটুকু করতে পারল! এর আগে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় সব শিশুকে ভর্তির বিষয়ে বাংলাদেশ একবার বড় সাফল্য দেখিয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েশিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অগ্রগতি অনুসরণযোগ্য। কিন্তু সেসব সাফল্যকে কেন্দ্র করে গুণগত শিক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে দেশটির অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্যের মধ্যে ঠিক কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাংলাদেশ এই সাফল্য পেয়েছে, সেটি ২০৫০ সালে অনুসন্ধানের বিষয়।
ওপরের কথাগুলো শুনতে হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে এবং সেটিই স্বাভাবিক। তবে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের একটি উক্তি রয়েছে এ রকম— জ্ঞানের চেয়ে কল্পনা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জ্ঞান সীমিত কিন্তু কল্পনা অগ্রগতিতে প্রেরণা জোগায়। ভালো একটি ভবিষ্যতের কল্পনা না করতে পারলে আমরা সেখানে কী করে পৌঁছাব?
বর্তমান শিক্ষার নানা বিষয় বিবেচনায় নিলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থা সুখকর নয়। স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টিকে থাকা ও বিকশিত হওয়ার জন্য যে দক্ষতা আর যোগ্যতা আশা করা হয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বাস্তব মান তার থেকে দূরে। কয়েক বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণের পরও অনেক শিক্ষার্থী ঠিকমতো পড়তে বা লিখতে পারে না; গণিত, বিজ্ঞান বা যুক্তির প্রয়োগ তো অনেক দূরের বিষয়! সেখানে ওপরের কল্পিত চিত্রটি পরিহাসের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এ রকম একটি কল্পনাকে কেন্দ্র করেই হয়তো আমরা আমাদের শিক্ষার অগ্রগতি নির্ধারণ করতে পারি।
শ্রেণিকক্ষে কীভাবে শিক্ষার্থীদের বিকশিত করতে হবে সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞান না নিয়ে শুধু একটি পরীক্ষা দিয়ে যে কেউ শিক্ষক যাতে না হতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষকতা পেশাকে মর্যাদাপূর্ণ ও আর্থিক বিচারে আকর্ষণীয় করতে হবে
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে আমরা কী প্রত্যাশা করি? একটি ন্যূনতম প্রত্যাশা রয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষার পর শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কিছু বিষয় বা লেখা পড়তে পারবে, দরকারি বিষয়গুলো নিজে নিজে লিখতে পারবে, কিংবা যথাযথ গাণিতিক দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। মাধ্যমিক শিক্ষার পর শিক্ষার্থীরা এমন কিছু জ্ঞান অর্জন করবে বিদ্যালয় থেকে, যা দিয়ে তারা জীবনে চলার মতো দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করবে কিংবা নিজেকে পরবর্তী পর্যায়ের জন্য করবে প্রস্তুত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার আলোচনা এখানে আনছি না, কারণ প্রাথমিক শিক্ষা ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত ভিত্তিই পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান নির্ধারণ করে। প্রাথমিক শিক্ষা একটি দেশের শিক্ষার মূল ভিত্তি। গুণগত মাধ্যমিক শিক্ষা সেই ভিত্তিকে মজবুত করে, শিক্ষার্থীদের পরিচালিত করে উচ্চতর শিক্ষার দিকে। পাশাপাশি, শিক্ষার আরেকটি বড় কাজ রয়েছে— শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের মানবিক বোধ জাগ্রত ও বিকশিত করা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য সমাজ ও রাষ্ট্রের চাহিদা অনুসারে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলা হলেও শিক্ষার মূল কাজ শিক্ষার্থীর মধ্যকার নানা গুণাবলি বিকশিত করা, যাতে তারা সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য পালন করতে পারে ইতিবাচক ভূমিকা।
সন্দেহ নেই, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এসব প্রসঙ্গকে একটি গ্রহণযোগ্য মানে উন্নীত করতে সার্বিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা যদি ২০৫০ সালে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ওপরের কষ্টকল্পিত অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে আমাদের সামষ্টিকভাবে কী করণীয়, সেগুলো বোধহয় ভাবা যেতে পারে। সন্দেহ নেই, আশু ও দূরবর্তী করণীয় বিষয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হলে সেই তালিকার উপাদান অনেক বড়ই হবে। সেদিকে না গিয়ে কিছু জরুরি বিষয় আনা যেতে পারে আলোচনায়।
প্রথম বিষয়টি হচ্ছে, প্রয়োজন অনুসারে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য উপযুক্ত সম্পদের জোগান দেওয়া এবং সেটি সরকারেরই কাজ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তিযোগ্য শিক্ষার্থী-সংখ্যা অনুসারে বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পনামাফিক এবং প্রয়োজনীয় বিদ্যালয় স্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় এমনভাবে বিদ্যালয়ের বিন্যাস হওয়া প্রয়োজন, যাতে ক্যাচমেন্ট এলাকায় থাকা প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে সহজে ভর্তি হতে পারে। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট এলাকার শিক্ষার্থীকে যেন তার ক্যাচমেন্ট এলাকার বিদ্যালয়েই ভর্তি করা হয়, এমন একটি সাধারণ নিয়ম শ্রেণি-পেশা, নির্বিশেষে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই কাজটুকু করা গেলে একদিকে যেমন লটারি বা ভর্তি পরীক্ষার মতো অবৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো এড়ানো যাবে, তেমনি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই পদক্ষেপটি ভালো বা খারাপ বিদ্যালয়ের পার্থক্যও কমিয়ে আনবে অনেকাংশে।
বিদ্যালয় স্থাপন ও পরিকল্পনামাফিক বিন্যাসের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ সরবরাহ করাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য প্রচুর উপকরণের প্রয়োজন হবে এবং সরকারের সেখানে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার যদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে এ কাজটি করে এবং সেখানে স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে কম খরচ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও খরচবিহীন উপকরণের সমন্বয় করে, তাহলে সীমিত বাজেটেও অনেক কিছু করা সম্ভব। বিশ্বব্যাপী এ রকম উদ্যোগের রয়েছে প্রচুর উদাহরণ।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে, তা হচ্ছে—প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ প্রদান। এখানে সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি আনুষঙ্গিক বিষয় জড়িত। প্রথমত, শুরুতেই নির্ধারণ করতে হবে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত কী হলে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। বর্তমানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০-কে সামনে রাখা হলেও, বাস্তবে এটি আরও বেশি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং প্রক্রিয়া পুরোপুরি ভিন্ন। এ দুই স্তরের শিক্ষাকে একটি মানে উন্নীত করতে হলে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি ১০-১৫ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকপ্রতি শিক্ষার্থী-সংখ্যা সর্বোচ্চ ২০ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন করতে হবে, যাতে শিক্ষকরা একটি ন্যূনতম শিক্ষাদান যোগ্যতা নিয়েই তবে শিক্ষক হতে পারেন। শ্রেণিকক্ষে কীভাবে শিক্ষার্থীদের বিকশিত করতে হবে এবং তাদের শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে, সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞান না নিয়ে শুধু একটি পরীক্ষা দিয়ে যে কেউ শিক্ষক যাতে না হতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, শিক্ষকতা পেশাকে মর্যাদাপূর্ণ ও আর্থিক বিচারে আকর্ষণীয় করতে হবে, যাতে শিক্ষক হিসেবে যারা কাজ করতে আগ্রহী, তারা যেন এই পেশাকে গ্রহণ করেন সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে।
তৃতীয় যে বিষয়টিকে এখানে গুরুত্ব দিতে চাই, তা হলো—বিদ্যালয়কে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিদ্যালয়ের অবদান প্রতিফলিত হয়। আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি বা অভিভাবকরা সম্পৃক্ত থাকেন সত্যি, কিন্তু সেটি আসলে আলংকারিক। বিদ্যালয় ও সমাজের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হলে এমন কৌশল প্রণয়ন প্রয়োজন, যেখানে সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিদ্যালয় সরাসরি অবদান রাখতে পারবে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যতটা চাকরি বা বাজার অভিমুখী, ঠিক ততটাই সমাজের বা স্থানীয় চাহিদা থেকে দূরে। বিদ্যালয় একটি সামাজিক সংগঠন, ফলে বিদ্যালয় ও সমাজের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ শিক্ষার ফলকে আরও বেশি দৃশ্যমান ও কার্যকর করে তুলতে সক্ষম।
সর্বশেষ গুরুত্ব দিতে চাই আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্যকে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রচুর ডকুমেন্ট তৈরি হয়েছে এবং এসব ডকুমেন্টে প্রচুর ভালো কথা বলা হয়েছে। সর্বশেষ আমরা শুনেছি, কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ঠিক কোন পর্যায়ের জন্য আমরা এই মুহূর্তে প্রস্তুত, সে বিষয়ে কি আমাদের আদৌ বাস্তবসম্মত ধারণা রয়েছে? পৃথিবী প্রতিযোগিতাময়, কিন্তু সব প্রতিযোগিতায় আমাদের অংশগ্রহণ না করলেও চলবে; বরং আমরা কীভাবে আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দক্ষতাগুলো নিশ্চিত করতে পারি এবং কীভাবে কিছু সাধারণ মানবিক মূল্যবোধকে বিকশিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে পারি, সেগুলোই আমাদের শিক্ষার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হওয়া প্রয়োজন।
হয়তো লক্ষ করেছেন, প্রথম অনুচ্ছেদে যা কল্পনা করেছিলাম, সে অনুসারে করণীয়গুলো সাদামাটা। বাস্তবতা হচ্ছে, এই করণীয়গুলো সবাই জানেন। সবচেয়ে বেশি জানেন নীতিনির্ধারকরা। এগুলো বাস্তবায়নে অনেকে হয়তো শিক্ষার স্বল্প বাজেটের কথা বলতে পারেন, আর এখানেই সরকারের করণীয় বেশি। সরকার চাইলে ধাপে ধাপে শিক্ষার জন্য গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা করতে পারে, সে অনুসারে বাজেট বরাদ্দ করতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ সম্ভাবনাময়। সীমিত সম্পদে এ দেশের মানুষ অনেক বড় কাজ করে দেখিয়েছেন। শুরুর এই কষ্টকল্পনা বাস্তব করতে আসলে বেশি কিছু বা বড় কিছু করার দরকার নেই, যেগুলো মৌলিক বা অবশ্যকরণীয় হিসেবে বিবেচিত, সেগুলো নিশ্চিত করা গেলেই বাংলাদেশের উদাহরণ বিশ্বে আলোচিত হবে—শিক্ষা সেক্টরে আড়াই দশকেরও বেশি কাজ করার সুবাদে আমার অন্তত এই প্রত্যয়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়





