৭ স্থপতি
বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন জিয়াউর রহমান

জিয়াউর রহমান (১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ – ৩০ মে ১৯৮১)
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের তত্ত্বকে জনপ্রিয় করে বাংলাদেশের জনমানসে স্থায়ী আসন করে নেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জিয়া মনে করতেন, ভাষা বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে নয়, ভূখণ্ডের ভিত্তিতেই জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করা উচিত।
জিয়াউর রহমান পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৫ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদবিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। সামরিক বাহিনীতে তিনি একজন সুদক্ষ ছত্রীসেনা ও কমান্ডো হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স কোর্সে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। করাচিতে দুই বছর কর্মরত থাকার পর ১৯৫৭ সালে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হয়ে আসেন। তিনি ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে তিনি বীরত্বের পরিচয় দেন। যুদ্ধে সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জিয়াউর রহমানকে হিলাল-ই-জুরাত খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৬৯ সালে তিনি মেজর পদবিতে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭০ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি এবং চট্টগ্রামে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালায়। সে রাতে পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। ওই সংকটময় মুহূর্তে জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন জিয়াউর রহমান এবং চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, মিরসরাই, রামগড়, ফেনী, নোয়াখালী প্রভৃতি স্থানে যুদ্ধ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ১৪০০ খাল খনন ও পুনঃখনন করেন তিনি। গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অল্প সময়ে ৪০ লাখ মানুষকে অক্ষরজ্ঞানের আওতায় আনেন
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান করেন।
জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। তিনি সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন, ফলে সংবাদপত্রের মাধ্যমে তথ্যের অবাধপ্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে প্রধান করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন। ছয়টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অংশ নেন এবং ৭৬.৬৭ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। এরপর মে মাসে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং আস্থা যাচাইয়ের জন্য ৩০ মে অনুষ্ঠিত গণভোটে হ্যাঁ-সূচক ভোটে বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন। ১ সেপ্টেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন।
খাল খনন, গণশিক্ষা ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড। সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুনঃখনন। গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অতি অল্প সময়ে ৪০ লাখ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান আওতায় নিয়ে আসেন। গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা প্রদান ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) গঠন করেন তিনি। প্রবর্তন করেন গ্রাম সরকারব্যবস্থার। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্য নিয়ে ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তার অন্যতম কীর্তি।
জিয়ার শাসনামল জুড়েই সেনাবাহিনীতে নানা রকম সংকট দেখা দিয়েছিল। নানা উপায়ে সেসব সংকট তিনি সমাধান করেছেন। ১৯৮১ সালের ২৯ মে তিনি চট্টগ্রামে আসেন চট্টগ্রামের স্থানীয় সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ঘটিত কলহ থামানোর জন্য এবং সেখানে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে থাকেন। কিন্তু ৩০ মে গভীর রাতে সার্কিট হাউজে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তিনি।




