যে টেলিফোন আসার কথা…

কোনো এক মধ্য দুপুরে ল্যান্ডফোন বেজে ওঠে। রিসিভার ওঠাতেই অপরপ্রান্ত থেকে মিহি কন্ঠে কথা বলে ওঠেন এক নারী-
‘আপনাদের দোতলা থেকে সাজ্জাদকে একটু ডেকে দেবেন?’
‘দোতলায় তো এই নামে কেউ থাকে না...’
‘তাহলে কে থাকে?’
‘আপনি কে বলছেন?’
‘সরি, রং নম্বর...’
তারপরই ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখার শব্দ হয়। সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
অথবা কোনো এক মধ্য রাতের গল্প। নৈঃশব্দ ভেঙে ফোন বাজে। রিসিভার কানে ধরতেই কারো উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শোনা যায়-
‘ভাই, আমি রাজশাহী থেকে বলছি। আপনাদের পাশের বাসায় একটা খবর দেবেন, আতিক সাহেবের বাবা কিছুক্ষণ আগে মারা গেছেন।’
ফোনের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মৃত্যুর মতো নীরবতায় সামান্য শব্দ তুলে।
একদা এভাবেই পাশের বাড়ির ফোন বেজে উঠত। চেনা-অচেনা কন্ঠস্বর অনুরোধ জানাত অন্য বাড়ির কাউকে ডেকে দেয়ার জন্য। কখনো আদানপ্রদান হতো জরুরি খবর, কখনো কুশল সংবাদ। ফোনের প্যাঁচালো তার বেয়ে নিঃশব্দচরণে কখনো আসতো প্রেম, কখনো দুঃসংবাদ। সেই ফোনের শ্রুতিমধুর রিং টোন শুনে বোঝার উপায় ছিল না কোন সংবাদ অথবা কোন মানুষটি অপেক্ষামান অপরপ্রান্তে। পাশের বাড়ির টেলিফোন বহু বছর আগে গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র হয়ে উঠেছিল এভাবেই।
প্রথম ল্যান্ডফোন আবিষ্কার হয়েছিল এখন থেকে দেড়শ বছর আগে ১৮৭৬ সালে। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের আবিষ্কার সেই সাধারণ ফোন থেকে প্রাথমিক অবস্থার মোবাইল ফোন মানুষের হাতে আসার মাঝখানের দূরত্ব ছিল ৯৭ বছর। সেই ৯ দশকে পৃথিবীর বহুকিছুই পাল্টে গেছে ম্যাজিকের মতো। এখন মোবাইল ফোনের যুগ, ইন্টারনেট সংযোগের আগ্রাসনের সময়। মানুষের হাতের মুঠোয় ধরা ফোনের স্ক্রিনে প্রতি মিনিটে আছড়ে পড়ছে অসংখ্য ফোন কল, ভেসে উঠছে প্রিয় মানুষের মুখ। কত তথ্য না জানা আমাদের বোকা মন ল্যান্ডফোনেই মুগ্ধ হয়ে ছিল।
ফোন প্রধানত দুজন মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়োজনে ব্যবহৃত যন্ত্র মাত্র। কিন্তু সেই পাশের বাড়ির টেলিফোনের যুগে যন্ত্রটি ব্যবহারকারীদের মধ্যে মধুর অথবা অম্ল সম্পর্ক তৈরি করে দিত। এমনও দেখা গেছে, এক বাড়ির গৃহিণী পাশের বাড়িতে ফোন করতে যেতেন হাতে সদ্য রান্না করা খাবার নিয়ে। আবার কেউ কেউ ফোন করতে এসে পাশের বাড়িতে মধ্যাহ্ন বা রাতের খাবার সেরে ফেলতেন। পাশের বাড়ির টেলিফোনটির অবস্থানের জন্য নির্ধারিত থাকত নির্জন বসবার ঘর অথবা শোবার ঘরে। সত্তর বা আশির দশকে পাশের বাড়ির ফোন জন্ম দিয়েছে বহু স্থায়ী অথবা অস্থায়ী প্রেমের গল্পেরও। সেই সময়ে ‘সরি, রং নম্বর’ কথাটিও ফোন ব্যবহারের অনুসঙ্গ হয়ে উঠেছিল। মাঝরাতে ভূতুড়ে ফোন কল বেজে উঠে মানুষকে ঘুম থেকে তুলে উদ্বিগ্ন বসিয়ে রাখত বিছানায়। জানার কোনো উপায় থাকত না কে ফোন করলো! সেই অনিশ্চয়তারও একটা মূল্য ছিল হয়ত তখন। গভীর রহস্য ছিল, অ্যাডভেঞ্চার ছিল সেই পাশের বাড়ির ফোনকে ঘিরে। কবি, চলচ্চিত্রকার, লেখক পূর্ণেন্দু পত্রী তার কবিতায় লিখেছিলেন,
প্রতিক্ষাতে প্রতিক্ষাতে সূর্য ডোবে রক্তপাতে
সব নিভিয়ে একলা আকাশ নিজের শূন্য বিছানাতে।
একান্তে যার হাসির কথা হাসেনি।
যে টেলিফোন আসার কথা আসেনি।
পূর্নেন্দু পত্রী সেই পাশের বাড়ির টেলিফোনের যুগে বসেই কবিতাটি লিখেছিলেন। তখন কোনো এক বিশেষ ফোন আসার অপেক্ষায় কেটে গেছে ভালোবাসার আলোকবর্ষ।
এখন সেই পাশের বাড়িটাই হারিয়ে গেছে আমাদের জীবন থেকে। বিদায় নিয়েছে পাশের বাড়ির টেলিফোনও। হাতের মুঠোয় ধরা চলমান টেলিফোন গোটা পৃথিবীকে এক লহমায় নিজস্ব যোগাযোগের জালে বেঁধে ফেলছে। কিন্তু পর্দার অন্তরালে চলে গেছে সেই যোগাযোগের সংস্কৃতি। মিলিয়ে গেছে পাশের বাড়ির প্রতিবেশীও। আমরা এখন ফোন দিয়েই একটি গ্লোবাল ভিলেজের অংশ হয়ে উঠেছি।
এই কথাটির সত্যতা চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। কিন্তু এমন কথাও তো সত্য যে ফোনের নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা আমাদেরকে আরও বেশি দূরত্বে সরিয়ে দিয়েছে? কেউ এখন আর ফোন এলে কাউকে ডেকে দেয়ার প্রয়োজনে পাশের বাড়িতে যায় না। ফোনে আসা বার্তা পৌঁছে দেয়ার প্রয়োজনও এখন হাস্যকর। গোটা পৃথিবীর সব খবর এখন বাঁধা আছে মুঠোফোনে। তাই কাউকে আর কোনোদিন কোনো বাড়িতে ফোন করে বলতে হবে না-অসময়ে বিরক্ত করছি, পাশের বাড়ি থেকে অমুককে একটু ডেকে দেয়া যাবে?





